সূর্যকে যেভাবে অস্বীকার করা যায় না, আজকের পৃথিবীতে তেমনি সংবাদপত্রকে অস্বীকার করা চলে না। সূর্য ছাড়া যেভাবে জীবন অচল, তেমনি সংবাদপত্র ছাড়া সভ্য পৃথিবীর অগ্রযাত্রাও অচল হতে বাধ্য। সূর্য যেভাবে গোটা পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করে নেয় আপন আলোয়, তেমনি সংবাদপত্রও নিজের বলয়কে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে। তামাম পৃথিবী আজ আকর্ষিত, আন্দোলিত ও কল্লোলিত হচ্ছে কোনো না কোনো সংবাদের প্রভাবে। পৃথিবীকে আজ শাসন করছে কোন শক্তি? এ প্রশ্নের জবাব অনেকেই অনেকভাবে দিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতার গভীরে গেলে স্বীকার করতে হয় যে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুনিয়া শাসন করছে যে শক্তি, তার নাম সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম।
সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম শাসন করবে তামাম পৃথিবীকে- এ স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিলো বিংশ শতাব্দীর গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের। উইলবার শ্রাম, ডেভিট কে বার্লো, শ্যানন উয়েভার, মার্শাল ম্যাকলুহান প্রমুখ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সংবাদমাধ্যমের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যে সকল গবেষণা করে গেছেন, সে সব গবেষণায় উঠে আসা ভবিষ্যৎবাণীর সার্থক প্রতিফলনই ঘটছে মূলত আজকের বিশ্বে। অতএব আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রে সংবাদপত্র অপরিহার্য। সেখানে এমন এক পরিবেশ থাকবে, যাতে সাংবাদিকরা তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে পেশাদারিত্ব চালিয়ে যেতে পারেন। রাষ্ট্র, গোষ্ঠী, কায়েমি শক্তি বা কোনো হীনস্বার্থের আক্রমণ কিংবা চোখ রাঙানি এ স্বাধীনতাকে পারবে না ব্যাহত করতে।
সাংবাদিকরা সংবাদপত্রে অনবরত লিখবেন। তবে তা হতে হবে- জনগণের স্বার্থের পক্ষে, দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রগতির পক্ষে, সত্য ও ন্যায়নীতির পক্ষে, মননশীলতার পক্ষে, সমাজ বিকাশ বা সমাজ রূপান্তরের পক্ষে, অর্থনৈতিক সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদের পক্ষে, শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে, গণমানুষের কর্মসংস্থানের পক্ষে, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পক্ষে, রাষ্ট্রের মৌল চেতনা ও আদর্শের পক্ষে, জনমত গঠনের লক্ষ্যে, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে, সভ্যতার অগ্রগতির পক্ষে, মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অধিকারের পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের পক্ষে, আইনের শাসনের পক্ষে, সর্বোপরি শুভশক্তির পক্ষে। এ সবের পক্ষে লেখাই হচ্ছে সাংবাদিকতা। এ সবের বিপক্ষে লেখাই হচ্ছে অপসাংবাদিকতা।
অপসাংবাদিকতা যখন কুয়াশায় আচ্ছন্ন করে দেয় মানুষের দৃষ্টি ও চেতনাকে, তখন বিবেকের আহবানে মানবিক দায়িত্বশীলতার নির্দেশে সোচ্চার হয়ে ওঠে সত্যিকার সাংবাদিকতা। সত্য এবং তথ্যকে অবলম্বন করে সেই সাংবাদিকতা বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে সৃষ্টি সুখের জয়োল্লাসে হয় নিমগ্ন। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদপত্র যখন সত্যকে উদ্ভাসিত করে, তখন জীবনের আকাশ থেকে পালাতে থাকে অন্ধকার। তখন তাতে জীবনের নিঃশ্বাস, ঘাম, রক্ত, যন্ত্রণা ও সংগ্রাম বাক্সময় হয়ে ওঠে। তখন ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টি হয় পরিচ্ছন্ন। পরিচ্ছন্ন আয়নায় তখন জীবনের স্বরূপকে আবিষ্কার করা যায়।
সংবাদপত্র যখন একটি জাতির পরিচ্ছন্ন আয়না হয়ে ওঠে, তখন এরচে বড় সার্থকতা আর হতে পারে না। সেই সার্থকতার আকাশকে স্পর্শ করবে বলেই তো এ দেশের সব ক’টি গণমাধ্যমের আত্মপ্রকাশ। ভিন্নমাত্রার দৈনিক ‘খোলা কাগজ’ও এর বিপরীতে নয়। আদর্শের এ দিক থেকে অন্য যে কোনো দশটি দৈনিকের চে পত্রিকাটি পিছিয়ে তো নয়ই বরং এগিয়ে আছে বহুভাবে। লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের পুণ্যবৃষ্টিতে সিক্ত এ দেশের উর্বর মাটিতে শিল্প, সাহিত্য, মননচর্চা ও সৃজনশীলতার নদী চিরকালই দ্রুত গতিতে বহমান। প্রাকৃতিক সজীবতার অনন্য এ উদ্যানে বৈষয়িক সমৃদ্ধির সুবাতাস যেমন বয়ে চলছে নিজস্ব গতিতে, ঠিক তেমনি সৃজনশীল জীবনসংগ্রামে মুখরিত এ মানচিত্র থেকে শিল্প, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় গৌরবময় কৃতিত্বের সুগন্ধি দশদিকে ছড়িছে এ জনপদ। অতীতের সেই ধারাবাহিকতায় আজও এখানে শিল্প-সাংবাদিকতার সুনিপুণ চাষাবাদ অব্যাহত। সত্য, ন্যায় ও বস্তুনিষ্ঠতার কিছু চাষি বাঙালির আত্মার শব্দাবলিকে কালের জমিনে জীবন্ত করে তুলতে অবিশ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন কলম সাধনা। সেই সাধনার প্রাণশক্তি কী? সন্দেহ নেই মানুষ ও মাতৃভূমির প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা, দায়িত্ববোধের তাগিদ আর গৌরবময় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বুকে ধারণ করার সততা ও ঐকান্তিকতা নিয়েই তো ‘খোলা কাগজ’-এর অভ্যুদয় হয়েছিলো বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। আজ থেকে সতেরো বছর পূর্বে পত্রিকাটি যাত্রা শুরু করলেও গরিয়ান ঐতিহ্যের ধারক এ দেশের সাংবাদিকতা একুশ শতকের ক্যানভাসে যে উজ্জ্বল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, ‘খোলা কাগজ’ সেখানে নাক্ষত্রিক সংযোজন হিসেবে সত্য, তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে সংবাদপত্র জগতে দৃষ্টান্ত স্থাপন শেষে নিরন্তর এগিয়ে যাবে- এমন আশা করতেই পারেন দেশের সব প্রগতিশীল বিবেক।
বর্তমানে বহু সংবাদপত্র সাংবাদিকতার নামে ভদ্রতার খোলসে কল্পনাপ্রসূত, মিথ্যা, বানোয়াট, অবাস্তব, অদ্ভুত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করে সাংবাদিকতা পেশাকে কলুষিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ‘খোলা কাগজ’ তার বিপরীতে দায়িত্বশীলতা, সত্যনিষ্ঠতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার পতাকাকে সমুন্নত করবে- এ প্রত্যাশা অমূলক নয় মোটেও।