রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কি আদৌ পাকিস্তানের কাছ থেকে তার পাওনা অর্থ আদায় করতে পারবে? পাকিস্তানিদের আগ্রাসন আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর চলে গেছে ৪৫ বছর। গণহত্যা চালানো পাকসেনাদের বিচার দূরে থাক, আর্থিক পাওনাই আদায় করতে পারছে না বাংলাদেশ।
১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসলে বঙ্গবন্ধু সরকার তার কাছে চারশ কোটি ডলার ন্যায্য পাওনা দাবি করেন। জুলফিকার আলী কৌশলে বঙ্গবন্ধুর দাবি এড়িয়ে যান। বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সরকারগুলোর পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সাথে সম্পদ বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
পাকিস্তান আমলের ডলারের মান ছিল এক টাকার বিপরীতে আট ডলার। সে হিসাবে বাংলাদেশ পাকিস্তান চার হাজার কোটি ডলার যা তখনকার টাকায় ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা। সুদ না ধরলেও ডলারের বর্তমান বিনিময় হারে তা প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। সুদ ধরলে সেটি আরও কয়েক গুণ হয়।
১৯৯৭ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তান সফর শেষে দেশে ফিরে এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে ২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ঢাকায় আসলেও সম্পদ বণ্টন বিষয়টির কোন সুরাহা হয়নি।
২০০৬ এর ১২-১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিহারি প্রত্যাবাসন ও সম্পদ বণ্টন বিষয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করবেন বলে জানান। তবে সম্পদ বণ্টনের বিষয়টি অমীমাংসিত রেখেই চারটি সমঝোতা স্মারক, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সমঝোতা শেষে দেশে ফিরে আসেন।
আরও নানা হিসাব
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট এবং ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যা ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি হিসেব করে অর্থনীতিবিদরা দেখেছেন, যুদ্ধের নয়মাস সরকারি ও বেসরকারি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১২৪৯ কোটি টাকা বা ১.২ বিলিয়ন ডলার।
১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সহায়তা হিসেবে বিভিন্ন দেশের পাঠানো ২০ কোটি ডলারও পায়নি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের মানুষ। এদিকে মানুষ মরেছে হাজারে হাজারে আর বিদেশিদের অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা জমিয়েছে তাদের ব্যাংক আর গুদামে।
পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানিরা এখন থেকে রপ্তানি খাত থেকে হওয়া আয়ের প্রায় পুরোটাই পাচার করেছে। এদেশের কৃষক- শ্রমিকের খাজনার টাকা গেছে পশ্চিম পাকিস্তানের পেটে। পূর্ব পাকিস্তানের টাকায় গড়ে উঠেছে করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ আর রাওয়ালপিন্ডির আধুনিক ভবন আর রাস্তাঘাট। এই হিসেব নেবে কে? দুইযুগে পাচার হওয়া বাংলাদেশের সম্পদ ফেরত চেয়ে পাঠানোর আছে কোন উপায়? আছে কোন উদ্যোগ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চারটি নীতি অনুসারে বাংলাদেশের দাবি সম্পূর্ণই যৌক্তিক। জনসংখ্যা নীতির নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ ৫৬ শতাংশ সম্পদ দাবি করতে পারে। সমতার নীতিতে বাংলাদেশ ৫০ শতাংশ দাবি করতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রানীতির ভিত্তিতে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান কর্তৃক অর্জিত মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তিতে ৫৪ শতাংশ সম্পদের দাবি করতে পারে। এছাড়া সমগ্র দেশের সম্পদের অনুপাতের নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ ৪৪ শতাংশ সম্পদ দাবি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশ বিভক্ত হয়ে পড়লে বা স্বাধীন হলে দেশটির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও বণ্টন হয়ে থাকে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের সম্পদের একটি অংশ বাংলাদেশের প্রাপ্য হলেও স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো সম্পদ পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ এখনো পায়নি।
পাকিস্তান শাসনামলে যেখানে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের ৫৬ শতাংশ কিংবা সমবণ্টনের ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ ঋণ পূর্ব পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিল, সেখানে পাকিস্তান ৭৬৪০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি পেলেও পূর্ব পাকিস্তান পেয়েছে মাত্র ২০২৪ মিলিয়ন ডলার বা ২৬.৬ শতাংশ। ঋণের ৬৪৩৯ মিলিয়ন ডলার কাজে লাগানো হয় এবং বাংলাদেশ পায় ১৯৪১ মিলিয়ন ডলার বা ৩০ শতাংশ।
পাকিস্তানের অধীনে পূর্ব পাকিস্তান রপ্তানির মোট আয় করেছিল প্রায় ৫৪.৭ শতাংশ বা ২৫,৫৫৯ মিলিয়ন টাকা বা ৫,৩৭০ মিলিয়ন ডলার। এখানে পশ্চিম পাকিস্তানের আয় ছিল ২১,১৩৭ মিলিয়ন টাকা বা ৪,৪৪০ মিলিয়ন ডলার। ৪৬,৬৯৬ মিলিয়ন টাকার মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের আমদানির জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ২০,০৬৭ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ ৪,২২৬ মিলিয়ন ডলার যেখানে পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে ৯,৩১২ মিলিয়ন ডলার। পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের উদ্বৃত্ত ৪৪২২ কোটি টাকা পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ব্যায় করা হয়। পাকিস্তান আমলে নেওয়া ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালের মধ্যে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে সমাপ্ত প্রকল্পের মোট ৫০৬.৭৬১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৩.৪৮৫ মিলিয়ন ডলারের দায় গ্রহণ করে।
এ ছাড়াও সেসময় চলমান প্রকল্পের ১৪৫.৮৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৩৬.১২১ মিলিয়ন ডলারের দায়ও বাংলাদেশ গ্রহণ করে। তৎকালীন, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক যেসকল পাকিস্তানি ছিল তারা যুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতার পূর্ব মূহূর্তে তাদের সম্পত্তি রেখেই বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যায়।
এই টাকা আদায় কীভাবে সম্ভব?
পাকিস্তানের কাছে পাওনা আদায় করা নিয়ে ঢাকাটাইমস কথা বলেছিল অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ এর সঙ্গে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘পাকিস্তান থেকে এই অর্থ উদ্ধারের জন্য সরকারকেই উদ্দ্যোগ নিয়ে প্রয়োজনে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সরকার যদি সুষ্ঠু হিসাব নিকাশ করে একটি দাবিপত্র বিশ্বের সকল বড় অর্থকরি প্রতিষ্ঠানে জমা দেয়, তবে পাকিস্তান থেকে পাওনা অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়ায় গতি আসবে।’
আনু মোহাম্মদ আরো বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রনীতি ও পরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশের পুরো অঞ্চলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তবে তাদের এই নীতির কারণে কিছু গোষ্ঠি লাভবান হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিজেরা ক্ষতিপূরণ না দিয়ে উল্টো বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ৭০০ কোটি টাকা দাবির প্রসঙ্গে আনু মোহাম্মদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘পাকিস্তানের এ দাবির মূল কারণ হল বাংলাদেশের সাথে তাদের অন্যায় ও দায়কে এড়িয়ে যাওয়া।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সরকারিভাবে দক্ষনেতৃত্বের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় পর্যায় বৈঠক করেতে হবে। এখানে পাকিস্তানের কোন সাড়া না পেলে প্রয়োজনে পার্শবর্তী দেশ ভারতসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।’
ডলারের বর্তমান মূল্যে প্রাপ্য অর্থ দাবি করা উচিত বলে মনে করেন এই সমাজবিজ্ঞানী। তিনি আরো বলেন, ‘এখানে যে যার কাছে টাকা পাবে সে তাকে পাওনা পরিশোধ করেব।’ পাকিস্তানি সম্পত্তির হিসাব ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের পাওনার সমন্বয় করেও এ সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।