সোমবার, আগস্ট ২০, ২০১৮

ঘাটাইলে গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু, দেড়লাখ টাকায় আপোসরফা

টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নের গৌরাঙ্গী গ্রামের হাক্কানী দরগাহ শরীফের পীর আব্দুল হালিম এর ঢাকা মিরপুর ছয় নং রোডের বাসায় ১১ বছরের গৃহকর্মীর মৃত্যু নিয়ে রহস্য ঘনিভূত হচ্ছে। ঘাটাইল থানা পুলিশের সহযোগিতায় ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নিহতের পরিবারকে দেড়লাখ টাকা আর ১২শতক জায়গার বিনিময়ে আপোসরফা হয়েছে বলে নানা সুত্রে জানা গেছে।

এদিকে এটি হত্যা, না ছাদে থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে এনিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে এলাকায়। নিহতের গায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখে এটিকে নিছক হত্যাকান্ড বলেই ধারনা করছে স্থানিয়রা। আর এ নিয়ে অভিযোগের তীর ছুড়েছে আব্দুল হালিমের ছেলে হামিম ও তার স্ত্রী জুলি এবং নিহতের দূরসম্পর্কের মামা সহিদ এর দিকে।

এ ঘটনায় নিহতের পরিবার নির্বাক হলেও এলাকাবাসির মাঝে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

নিহত রাসেল ঘাটাইলের গৌরাঙ্গী গ্রামের দিনমজুর আঃ হামিদের ছেলে। গত ১০ আগষ্ট ঢাকা মিরপুরের রোড নম্বর- ১১ , সেকশন- ৬- এর ১৩ নম্বর বাসার ৪র্থ তলার নিজ ফ্লাটে এ মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, হাক্কানী পীড়ের তত্বাবধায়ক আব্দুল হালিমের গ্রামের বাড়ি ঘাটাইলের গৌরাঙ্গী গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার মিরপুরে ৪ তলা ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করছেন। একই গ্রামের লোক হওয়ায় গত ৮ মাস আগে তার বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় রাসেল (১১)।

সরেজমিনে গৌরাঙ্গী গ্রামে নিহতের বাবা আঃ হামিদের সাথে কথা বললে তিনি জানান, ঘটনা আমি কিছু বলতে পারব না। ঘটনার মধ্যে আমি এইটুকু জানি গত ৯ আগষ্ট তারিখ বৃহস্পতিবার রাতে এশার নামাজের সময় আমার ছেলের সাথে কথা বলেছি। মোবাইলে বলছিলাম বাবা তুমি বাড়ি আসবা না। সে বলছিল বাবা আমি ঈদের মধ্যে বাড়ি আমু। এটাই ছিল আমার সাথে শেষ কথা। শুক্রবার বাসা থেকে জানানো হয় রাসেলের পাতলা পায়খানা হয়েছে। ওই রাত ১.১৫ মিনিটের সময় আমার খালাত শালা সহিদ গাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে বলে তোমার ছেলের অসুখ তোমাকে যেতে হবে। আমি আর আমার পরিবার দুজনে গেছি। ভোরে মিরপুরে ডেলটা হাসপাতালে যাই। সেখানে লাশটা চাদরে মোড়ানো ছিল। সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে পরে এ্যাম্বুলেন্সে করে লাশটা বাড়িতে নিয়ে আসি।

নিহতের বাবা আঃ হামিদ আরও বলেন, লাশের পুরো শরীরে জখমের চিহ্ন। ছাদে থেকে পড়লে হাত পা গুড়া হয়ে যেত। অন্ডকোষ গলানো ছিল।

মামলা করলেন না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি পরের জায়গায় থাকি। টাকা পয়সা নাই, মামলা মোকদ্দমা চালাইতে পারব না। আদালতে যাইতে গাড়ী ভাড়াও জোটাতে পারব না।

তিনি জানান, লাশটি পৌছানোর আগেই কবর কাটা হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে দাফনের প্রস্তুতি চলছিল। এলাকাবাসির চাপে থানা পুলিশ লাশটি থানায় নিয়ে যায়। পোষ্টমর্টেম শেষে রোববার লাশ দাফন করা হয়।

নিহতের বাবা বলেন, পরে থানায় বসে ৩০০টাকার ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে দেড় লাখ টাকা আর ১২শতক জায়গা জমি দেয়া হবে বলে জানানো হয়।

জানতে চাইলে হামিমের স্ত্রী জুলি বলেন, সন্ধ্যায় ছাদে খেলতে গেছিল, সেখান থেকে পড়ে গিয়ে এ ঘটনা ঘটে। নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন কেন এমন প্রশ্নের জবাবে ঘাটাইল ডট কমকে তিনি বলেন,বিল্ডিং-এর পাশে একটি গাছ রয়েছে, গাছ বেয়ে নামতে গিয়ে হয়তো এরকম আঘাত পেয়েছে।

জানতে চাইলে ঘাটাইল থানা অফিসার ইনচার্জ মাকছুদুল আলম ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, ছেলেটি ছাদে থেকে পড়ে মারা গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয়েছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুনেছি আপোষ হয়েছে। থানায় বসে আপোস হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, শুনেছি আপোস হয়েছে। থানায় বসে শুধু বাদী মামলা করবে না শর্ত সাপেক্ষে লেখালেখি হয়েছে। সে কাগজ আমার কাছে রয়েছে।

ঘাটাইলে সম্পদের লোভে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী খুন

 টাঙ্গাইলের ঘাটাইল পৌরর গড়জয়নাবাড়ী এলাকার আব্দুল লতিফ (৪৮) সম্পত্তির লোভে স্ত্রী ফরিদাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সে দেওপাড়া ইউনিয়নের শিবেরপাড়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে। এ বিষয়ে মৃতের চাচা উপজেলার ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের ইমান আলী (৫০) বাদী হয়ে গত ২৬ জুলাই টাঙ্গাইল জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে তিন জনের নাম উল্লেখ করে একটি সিআর মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-৩৩৯/১৮। তাদের দাবী ভাতিজীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাই কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পুনরায় ময়না তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

জানা যায়, ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের মৃত মালেক মাস্টারের একমাত্র কন্যা ফরিদা ইয়াসমিন (৪০) এর সাথে শিবেরপাড়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে আঃ লতিফ ওরফে লেবুর সাথে ১৯৯৪ সালে তাদের বিবাহ হয়। ২৪ বছর দাম্পত্ব স্বত্ব পালনকালে তাদের ঘরে দুইটি কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করে। প্রথম কন্যা লতিফা আক্তার (নিথি) বর্তমানে ঢাকায় এমআইএসটি (M.I.S.T)তে লেখাপড়া করে। দ্বিতীয় কন্যা ফামিম (০৮) গড়জয়নাবাড়ী বাসায় মায়ের সাথে থেকে ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। স্বামী আঃ লতিফ নৌবাহিনীতে চাকরী শেষে অবসর নিয়ে স্ত্রী কন্যা নিয়ে গড়জয়নাবাড়ী (ঝড়কা) নিজ বাসায় বসবাস করত।

যে রাতে ফরিদার মৃত্যু হয় :
মামলার বিবরণ, পুলিশের সুরতহাল রিপোর্ট, মামলার সাক্ষী হোসেন আলীর জবানবন্দি এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, পহেলা জুলাই রবিবার রাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বামী আঃ লতিফের ছোট ভাই খাজা মাঈন উদ্দিন (৩৮) ও তার চাচা আঃ কাদের ঐ রাতে গোপনে লতিফের গড়জয়ানাবাড়ী বাসায় অবস্থান নেয় এবং তারা গোপনে বৈঠক করে লতিফকে জমি লিখে না দেওয়া, স্বামীর অবাধ্য হয়ে চলা, ঘুমের ঔষধ সেবন করা সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা ফরিদার সাথে কথা শুরু করে। এক পর্যায়ে ঝগড়া বিবাদে পরিণত হয় এবং নির্যাতন করতে থাকে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে পাশের বাসার এক গৃহবধু জানায় যখন গভীর রাত, মানুষ ছাড়াও পশু পাখিরাও যখন ঘুমে- তখন হঠাৎ করে ফরিদার আকুতি সুরের কান্না, ধস্তাধস্তি ও আত্মচিৎকারের আওয়াজ কানে ভেসে আসে। অল্প কিছুক্ষন পরেই কান্নাকাটির আওয়াজ থেমে যায়। পরের দিন ২রা জুলাই স্বামী আঃ লতিফ ও তার লোকজন প্রচার করতে থাকে ফরিদা হার্ডএটাক্ট করে মারা গেছে।

তবে বাদী পক্ষের দাবি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠান্ডা মাথায় ফরিদাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। তার গলার দুই পাশে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। গলার দাগ গোপন করতে সেদিন ফরিদার গলায় মাফলার পেচানো ছিল এবং খুনের ঘটনা লোকচক্ষুর আড়াল করতে সেদিন এলাকাবাসী ও আপনজনকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে ভোর বেলায় কবর কাটা ও সকাল ৯টার আগেই জানাজা সম্পন্ন করে লাশ দাফনের প্রস্তুতি নিলে আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসী সন্দেহ হলে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে দাফনে বাধা দেয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে লাশ থানায় নিয়ে আসে এবং মর্গে পাঠায়।

যারা সেদিন লাশ দেখতে গিয়েছিল তাদের অনেককেই লাশ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি স্বামীর সাথে জমি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবাত মনোমালিন্য ছিল।

যে সব কারণে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ ছিল :
মামলার বিবরণ ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, নিহত ফরিদা ইয়াসমিন বাবা মার একমাত্র সন্তান। বাবা-মার মৃত্যুর পর ফরিদা পৈত্রিক সূত্রে ব্রাহ্মণশাসন, দিগড়, বসুবাড়ী, নজুনবাগ এবং গড়জয়নাবাড়ী ৫ মৌজায় ২টি বাসা সহ মোট ২১২ শতাংশ জমির মালিক হয়। যার আনুমানিক মূল্য ২/৩ কোটি টাকার উর্ধ্বে। লোভী আঃ লতিফ ঐসব জমি তার নামে লিখে দেওয়ার জন্য স্ত্রী ফরিদার উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু ফরিদা রাজী না হওয়ায় এক পর্যায়ে তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকে।

এছাড়াও স্বামী আঃ লতিফ নৌবাহিনীতে চাকুরী শেষে পেনশনের ১৬ লাখ টাকা ঘাটাইল পোস্ট অফিসে মাসিক মুনাফা হিসেবে স্ত্রী ফরিদার নামে জমা রাখে। বিনিময়ে ৩ কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে নেওয়ার জন্য নানান তালবাহানা ও কৌশলের আশ্রয় নেয়, কিন্তু ফরিদা স্বামীর দূরভীসন্ধি বুঝতে পেরে জমি লিখে দিতে অস্বীকার করে। এমতাবস্থায় স্বামী আঃ লতিফ ক্ষুদ্ধ হয়ে স্ত্রীর নামের জমা টাকা চাপ প্রয়োগ করে উত্তোলন করে নেয় এবং সেই টাকা নিজের সংসারে খরচ না করে তার বোনের ছেলেকে কানাডা পাঠায়। এই টাকা নিয়েও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ ছিল।

অপরদিকে নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশিদের কাছ থেকে জানা যায়, স্বামী স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। তারা একে অপরকে সন্দেহ করত। তাদের সন্দেহের কারনে ফরিদা স্বামীর উপর অভিমান করে ঘুমের ঔষধ সেবন করে। পরে হাসপাতালে তিনদিন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে পহেলা জুলাই টাঙ্গাইল থেকে ফরিদা ঝড়কা বাসায় এলে ঐ রাতেই ফরিদার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে ফরিদার স্বামী আঃ লতিফ ওরফে লেবুর কাছে জানতে চাইলে, তিনি জানান ফরিদা হার্ডএটাক্ট করে মারা গেছে। বাসার কাছেই হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডাক্তার থাকতে কেন তাকে হাসপাতালে নিলেন না উপরন্তু তাকে তড়িঘড়ি করে দাফন করতে ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মাথা ঠিক ছিল না তাই ভুল হয়ে গেছে।

ফরিদার মৃত্যুর দিন রাতে কেন ঝড়কা বাসায় গিয়েছিলেন জানতে চাইলে আঃ লতিফ এর ছোট ভাই খাজা মাঈন উদ্দিন কোন সদুত্তর উত্তর দিতে পারেনি।

ফরিদার মৃত্যু হত্যা, আত্মহত্যা না হার্ড এটাক্টে হয়েছে এ সব বিষয়ে ঘাটাইল থানার অফিসার্স ইনচার্জ মাকসুদুল আলম এর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ময়মাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।