আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের দুই মাস পূর্ণ হলো। একটা মন্ত্রিসভার জন্য দুইমাস যথেষ্ট সময় নয়, কিন্তু দুইমাসে মন্ত্রীদের কার্যক্রমে ভালোমন্দের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেখান থেকে একটা পথনির্দেশনা পাওয়া যাবে যে, মন্ত্রিরা কতদূর কি করবেন। তাঁরা দায়িত্ব পালনে কতটা সফল হবেন বা দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন কিনা বা সাহসী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছেন কিনা বা কোন মন্ত্রীর অবস্থান কি রকম, কোন মন্ত্রীর সাফল্য কতটুকু ব্যার্থতাই বা কি?
৭ই জানুয়ারি যে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে তাতে ছিল একটি চমক। অনেক সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছিল। যেখানে আনকোরা নতুনরা স্থান পেয়েছিলেন। কেমন করছে মন্ত্রিসভা?
প্রথম সাফল্য হলো, আমরা যদি গত দুই মাস সরকারের পারফরম্যান্স দেখি তাহলে দেখব যে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স হলো নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অবৈধ নদী দখল পুনরুদ্ধার করা। এই অবৈধ নদী দখল উদ্ধারে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের বিচারে গত দুই মাসে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এটি। দীর্ঘদিন ধরে এই নদী দখল উচ্ছেদের জন্য নানারকম উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল যার সবই ছিল কথার কথা। বাস্তবে কিছুই হয়নি। এবার সত্যিকার অর্থে দৃশ্যমানভাবে এই পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে। এটাকে গত দুইমাসে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে আমরা বিবেচনা করতে পারি।
দ্বিতীয়, গত আমলে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এই মেয়াদের সরকারের ইতিবাচক দিক হচ্ছে কক্সবাজারে যারা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাঁদেরকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়েছে। শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেছে যেটাকে সাধারণ মানুষ সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে মনে করেন।
তৃতীয়, এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। প্রশ্নফাঁস সরকারের জন্য একটি বিব্রতকত পরিস্থিতি ছিল। গত মেয়াদে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম কথা বললেও সরকার দায়িত্বশীল কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। এইবার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটা এই সরকারের অনেক বড় একটা সাফল্য বলে অনেকেই মনে করেন। ।
চতুর্থ, এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই একটা ধর্মীয় সমস্যা দেখা দিয়েছিল যে, বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে বিবাদমান দুই পক্ষের একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল কিন্তু ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এবং সরকারের উদ্যোগে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। সরকার সবকিছু সুন্দরভাবে একটি সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছে। এটাও সরকারের একটা বড় সাফল্য বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। ধর্ম নিয়ে জনমনে যে একটা বিরুপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল সেখান থেকে দেশকে সরকার মুক্তি দিয়েছে। কাজেই এটাকে সরকারের একটা উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলা যেতে পারে।
পঞ্চম, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূণ্য সহিষ্ণুতা ঘোষণা করেছেন। যার ফলে সরকারের এই মেয়াদের প্রথম থেকেই দুর্নীতির ব্যাপারে একটা কঠোর মনোভাব সরকারের মধ্যে দৃশ্যমান। এটা সরকারের জন্য একটা ইতিবাচক বার্তা বহন করছে এবং সাধারণ মানুষ এই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে।
গত দুই মাসে সরকারের এই ৫ টি সাফল্যই উল্লেখযোগ্য বলে মনে করা হয়। এই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা অবশ্যই এই সাফল্যের অংশীদার। সাফল্যর সঙ্গে ব্যার্থতাও অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। বিগত দুই মাসে সরকারের বেশ ব্যর্থতাও রয়ে গেছে। যেমন:
প্রথম ব্যার্থতা, সবচেয়ে বড় ব্যার্থতা মনে করা হচ্ছে, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা। এই সরকারের প্রথম মেয়াদেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং সরকার তখন যেসমস্ত অঙ্গিকার দিয়েছিল, তার কোনটাই প্রতিফলিত হয়নি এবং যার ফলে এই দুর্ঘটনা একটা অমার্জনীয় হিসেব দেখা হচ্ছে। যদিও এই দুর্ঘটনার পর সরকার থেকে বলা হয়েছে, এখন রাসায়নিক দ্রব্যগুলো উচ্ছেদ করা হবে এবং সেরকম ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই উচ্চেদ নিয়ে সরকার আরেকটা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
দ্বিতীয়, একটি দুবাইগামী বাংলাদেশি বিমানের মধ্যে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ এবং কথিত বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা। এটা সাধারণ মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে। শুধু সাধারন মানুষ নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে এবং এটার পরে বিমানের যে কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মহল যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেই ব্যাখ্যাটাও সাধারন মানুষের কাছে ধোয়াশা, অস্পষ্ট এবং বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। কাজেই, এই ঘটনাকেও মনে করা হয় সরকারের একটি নেতিবাচক দিক।
তৃতীয়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহনের পর সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ সড়কের জণ্য অনেকগুলো পদক্ষেপ, নীতিনির্দেশনা ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত সড়কে নিরাপত্তা ফিরে আসেনি এবং সড়কে যে নিয়মনীতি শৃঙ্খলা, সেটা ফিরে আসেনি। বরং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরী হয়েছে।
চতুর্থ, সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই বলেছিল, ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আর নতুন ঋণ খেলাপি হতে দেওয়া হবে না। ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো কথা, বক্তৃতা, বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ঋণ খেলাপির পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। যদিও মনে করা হয়, ঋণ খেলাপি বন্ধ করার জন্য দুই মাস যথেষ্ঠ সময় নয়। তারপরও দুই মাসে কোন দৃশ্যমান কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
পঞ্চম, সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বলা হয়েছিল যে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। ভূমি মন্ত্রী নিজে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, একমাসের মধ্যে প্রত্যেকটা ভূমি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসেব তার কাছে জমা দিতে হবে। এটা তার আদেশ, কিন্তু তা প্রতিপালনের দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ আমরা দেখিনি। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে কোন পদক্ষেপ বা কার্যক্রম আমরা পরিলক্ষণ করিনি।
সাফল্য- ব্যার্থতা নিয়ে একটি সরকার। কাজেই, এই সরকারের গত দুই মাসে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, সেটা হচ্ছে সরকারের মধ্যে মন্ত্রীরা কাজ শিখতে চাচ্ছেন এবং মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে বাইরে খুব কম কথা বলছেন। প্রথম দিকে মন্ত্রীরা অনেক কথাবার্তা বললেও আস্তে আস্তে মন্ত্রীরা কথাবার্তা কমিয়ে দিয়েছেন। এটা ইতিবাচক দিক এবং তারা নিজেদের মন্ত্রণালয়ের কাজের দিকেই মনোনিবেশ করছেন। দুই মাসের এই চিত্রটা আরও স্পষ্ট হবে আগামী দিনে তারা কিভাবে দায়িত্ব পালন করে সেটার উপর।
-- বাংলা ইনসাইডার