আনোয়ার হোসেন বকুল
শামসুল হক চিশতি বললে কেউ চিনবেন না তাঁকে। যদিও তরিকত প্রেমীরা তাঁকে ঠিকই চিনেন। আবার শামসু মুন্সি বললে যারা চিনেন তারা জানেন না তিনি পীর ছিলেন। শামসুল হক চিশতি ময়মনসিংহের প্রক্ষ্যাত পীর আনোয়ার হোসেন চিশতি (র:) নিকট বায়াত গ্রহণ করে সুদীর্ঘকাল এলমে তাছাউফ বা সুফিবাদ অনুশিলন করেছেন। আমরা এমন গুনিদের কদর দিতে জানি না। তাঁদের স্বরণ করি না। এ কারণে নিরবে নিঃশব্দে কেটে যায় তাদের জন্ম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৫৩ সালের ৩১ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার লোকেরপাড়া গ্রামে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন শামসুল হক চিশতি। তাঁর পিতার নাম মরহুম জুব্বার আলী শেখ, মাতা মরহুমা আম্বিয়া খাতুন। তারা উভয় ছিলেন অত্যান্ত আদর্শবান ধর্মানুরাগী মানুষ। শামসুল হক চিশতি ছোট বেলা থেকেই সুন্দর মনের মানুষ ছিলেন। সে কথা বলতেন নম্র, ভদ্র মার্জিত ভাষায়। তাঁর মতো উন্নতমনের মানুষ সমাজে খুব কমই পাওয়া যায়। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে ছাত্র জীবনে তাঁকে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তবুও দৃঢ়তার সহিত জীবন সংগ্রামে নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে এগিয়ে গেছেন। গুণী এ মানুষটি ২০১০ সালের ২০ আগষ্ট বাংলা ৫ ভাদ্র ১৪১৭ বঙ্গাদ্ধে সুখ-দুঃখ ভরা পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। কাগমারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শামসুল হকের পড়া লেখার হাতে খড়ি। এরপর লোকেরপাড়া মাদ্রাসা ও দুর্গাপুর মাদ্রাসায় অধ্যায়ন করে ভর্তি হন সিংগুরিয়া লোকেরপাড়া স্যার আব্দুল হালিম গজনবী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে তিনটি লেটারসহ প্রথম শ্রেণীতে এসএসসি পাস করেন। এ সফলতার জন্য কর্তৃপক্ষ তাকে স্বর্ণপদক প্রদান করেন। তিনি হলেন অত্র বিদ্যালয়ের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ী ছাত্র। এর পর ইব্রাহীম খাঁ কলেজ থেকে সফলতার সাথে আইকম ও বিকম পাস করলেও পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে এখানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। উত্তরা ব্যাংকে চাকুরির মাধ্যমে শুরু করেন কর্ম জীবন। কর্মজীবনে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। সফল ভাবে দায়িত্ব পালনে স্বীকৃতি স্বরূপ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে টানা ছয় মাসের ছুটি ও পদন্নতি প্রদান করেন। শামসুল হক চিশতির অনুসারি গ্রামবাসি ও শুভাকাংক্ষীদের নিকট থেকে জানা যায়, তিনি কৈশরকাল থেকেই মেধাবি ছাত্র ছিলেন। তাঁর হিংসা ছিল না। তিনি বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করতে শিখাতেন। সকল ব্যাথিতের ব্যাথায়, সকল অসহায়ের অশ্রুজলে নিজেকে অনুভব করতেন। সমাজের প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধার চেষ্টা করতেন। কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে তরিকত ও সুফিবাদ বুঝাতেন। তিনি সব সময় বলতেন মানব ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তার মন প্রাণ সেকালেই গ্রাস করেছিল সুফিবাদ ও এলমে তাছাউফ। এমন কি কলেজ জীবনেও তরিকত প্রেমীদের নিকট ছুঁটে বেড়িয়েছেন। কর্ম জীবনে চাকুরির পাশা পাশি এলমে তাছাউফ ও সুফিজম নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষণার সুবিধার্থে সনাতন ধর্মসহ অন্যান্য ধর্ম বিষয়েও জ্ঞাণ অর্জন করেছেন। লিখেছেন “ধর্মই মানবতা মানবতাই ধর্ম” নামে একটি গবেষণালব্দ গ্রন্থ। রচনা করেছেন তরিকত ও ভক্তিমুলক তিন শতাধীক গান। শেষ পযর্ন্ত সে নিজেকে পীর হিসেবে আত্নপ্রকাশ করা তার কৈশর, যৌবন ও কর্মজীবনের অর্জিত জ্ঞানরই ফল। শামসুল হক চিশতির ধ্যান, জ্ঞাণ ছিল সমাজে সঠিক সুফিবাদ প্রতিষ্ঠা করা। এলমে তাছাউফ বা সুফিবাদের নামে ভন্ডামি মানতেন না। এলমে তাছাউফ বা সুফিবাদের নামে ভন্ডামি দেখলেই দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এ কারণে ভন্ড তরিকত পন্থীদের নিন্দার কাঁটা তাকে সহ্য করতে হয়েছে। তরিকত বিরোধীদের কেউ তিনি কাছে টেনেছেন। ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধার চেষ্ঠা করেছেন। প্রমাণ করতে চেয়েছেন মানবতার উপর কোন ধর্ম নাই। মানব ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। শাহআলম চৌধুরী, জামাল হোসেন, লুৎফর রহমান তালুকদার মিন্টু, শাহজাহান মিয়া, জুলহাস উদ্দিন, রবি শেখ, আব্দুস সাত্তার আকন্দ, নূরুল ইসলাম ও হুরমুজ আলীসহ এলাকার তরিকত প্রেমীরা শামসুল হক চিশতির এলমে তাছাউফ ও সুফিবাদের জ্ঞাণলব্দ আলোচনার মুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন। শামসুল হত চিশতি চাকুরি থেকে বাড়ী এলে তার সান্নিধ্য লাভে এলাকার তরিকত প্রেমীরা ছুঁটে আসতেন। তারা তরিকত জগতের নানা বিষয় শামসুল হকের নিকট থেকে জানার চেষ্টা করতেন। তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, কান্না, ব্যাথা-বঞ্চনা ও দীর্ঘশ্বাস রোমন্থন করতেন। তিনি যে কয়েকদিন বাড়ীতে থাকতেন সব রাতেই তারা এসে জরো হতো। কখনোও সেখানে নেচে গেয়ে আনন্দের হিল্লোল জাগাতো। আবার কখনোও বেদনার তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো। দুনিয়ার চাওয়া পাওয়া ভুলে সকলে একাকার হয়ে পরপারের চিন্তায় মগ্ন হতো। শামসুল হক চিশতির বেলায়েতের প্রধান আব্দুল মজিদ। তিনি তার পীরকে মূল্যায়ন করেন এভাবে- “শামসুল হক চিশতি জীবন ও জগতের বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা করেছেন। ইসলামের সাথে সংগতি রেখে গভীর ভাবে চিন্তা করে এসব বিষয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন। উত্তম জীবন কীভাবে লাভ করা যায় ইসলামী দর্শন দিয়ে তা বুঝাতেন। তিনি বলতেন ইসলামী দর্শনের জ্ঞাণ ছাড়া সার্থক, সুন্দর জীবন যাপনের সুযোগ নেই। তিনি গভীর ভাবে সুফিবাদ অনুস্বরণ করে এর একটি পূর্ণাঙ্গরূপ তার জীবনে প্রষ্পুঠিত করার তফশারত ছিলেন। বলতেন চিন্তার অসুস্থতা বিবেককে বিকৃত করে। বিকৃত বিবেক নিয়ে স্বপ্ন দেখা নিরর্থক। ব্যার্থতার সুমদ্রে সাঁতার কাটা মাত্র।” একই পাড়ায় বাড়ী হলেও শামসুল হক চিশতির সাথে আমার খুব একটা মেশার সুযোগ হয়নি। সম্ভবত ১৯৯৫সাল । তখন আমি ইব্রাহীম খাঁ কলেজের ছাত্র। বড় ভাই হুরমুজ আলী এক দিন রাতে আমাকে শামসুল হক চিশতির সান্নিধ্যে নিয়ে যান। এলাকার তরিকত প্রেমীদের নিয়ে আলোচনারত আছেন তিনি। অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা চলছে। নিরবে হুরমুজ ভাইয়ের পাশে বসে তা শুনলাম। তরিকতের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হলো। কথাগুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, এই মানুষটির নিকট আমাদের কিছু জানার আছে, শেখার আছে। পীর ফকিরদের অনেক কর্মকান্ডই আমি পছন্দ করি না। এরপরও শামসুল হক চিশতির নিকট তরিকত বিষয়ে জানার ইচ্ছা প্রকাশ না করে পারলাম না। বিনয়ের সঙ্গে বললাম তরিকত নিয়ে সমাজে নানা অপবাদ আছে। এবিষয়ে জানতে চাই ? উত্তরে তিনি বলনেন, “তরিকতের অনেক বিষয় আছে, সব কিছু সবার নিকট বলা যায় না। এমন কিছু আছে যা সবাই বুঝেও না । হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, আপনার বক্তব্য সবাই নাও বুঝতে পারে। তবে সত্যিকারের জ্ঞাণীরাতো কখনো মুখ দেখে বক্তব্য দেয় না, সাহস করে বললাম আমি। উৎফুল্লচিত্তে আমাকে বললেন, তোমার জানার আগ্রহ আছে, খুশি হলাম। আগামী সপ্তাহে বাড়ী এসে তোমাকে নিয়ে বসবো। পরের সপ্তাহে হুরমুজ ভাই ও ছোহরাব কাকাকে সাথে নিয়ে হাজির হলাম শামসুল হক চিশতির নিকট। তিনি আলোচনা শুরু করলেন জিকির দিয়ে। কিছু মানুষ বিদ্রুপ করে বলে, ফকিরেরা জিকির করে, বেড়া ভাইঙ্গা বাইড়ে পড়ে। জিকির না করে, জিকিরের মাহফিলে না গিয়ে, জাকেরিনদের সুহবতে না বসে শুধু শুধু জিকির নিয়ে মন্তব্য ঠিক নয়। জিকির আল্লাহর পছন্দনীয় একটি ইবাদত। জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে বেশি স্বরণ করা যায়। চাই জিকির সম্মিলিত হোক, একাকি হোক, উচ্চস্বরে হোক বা নিচুস্বরে হোক। তিনি বলেন, প্রিয়ার দিদারে ধন্য যারা, তাদের কাছে বসতে হবে। তাদের মুখ থেকে শুনতে হবে, তার সৌন্দর্যের আলোচনা, মহিমার আলোচনা, কুদরতের আলোচনা ও করুনার আলোচনা। প্রেমীকদের সান্নিধ্যে বসলে তার অন্তরেও জ্বলে উঠবে প্রেমের আগুন। আগুন যায় ঘরে থেকে ঘরে, প্রেম যায় অন্তর থেকে অন্তরে। তাই এমন ব্যক্তিদের সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে যাদের অন্তরে হরদম জ্বলে প্রেমের আগুন। শামসুল হক চিশতি এলাকার তরিকত প্রেমীদের এক প্লাটফর্মে আনার জন্য বহু চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করতেন নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিভাজন তরিকতকে দুর্ভল করে ফেলেছে। বিভেদ ও বিভাজনের হাত থেকে তরিকত প্রেমীদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে সুন্দর মনের মানুষ সৃষ্টি হবে। কুলষিত দুর করে সমাজে সঠিক এলমেতাছাউফ ও সুফিবাদের জাগরণ সৃষ্টি করা যাবে। করা যাবে তরিকতের উপর চাপিয়ে দেওয়া কলঙ্ক মোচন। তরিকত প্রেমীদের নিকট শামসুল হক চিশতির স্মৃতি ও অবদান চির অম্লান হয়ে থাকবে। তার ষষ্ঠ ওফাত বার্ষিকীতে আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
অামাদের ঘাটাইল সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷