রেজাউল করিম, ঢাকাটাইমস টাঙ্গাইল: আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন দলের প্রভাবশালী নেতা এমপি রানাসহ তার চার ভাই। অর্ধশত মামলা কাঁধে নিয়েও খান পরিবারের এই চার সহোদর পুরো টাঙ্গাইলে রাজত্ব করেছেন নির্বিঘ্নে। সেই রাজত্ব এখন অতীত হতে চলেছে।
ক্ষমতাসীন দলসংশ্লিষ্ট এই চার সহোদর হলেন ঘাটাইল আসনের সাংসদ আমানুর রহমান খান (রানা), টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান (মুক্তি), ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান (কাকন) ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সানিয়াত খান (বাপ্পা) ।
জেলা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন চলছে যেকোনো সময় তারা দল থেকে বহিষ্কার হতে পারেন।
টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগের অপর এক শক্তি সিদ্দিকী পরিবারকে কোণঠাসা করে পুরো টাঙ্গাইল জেলা রাজত্ব করেন প্রভাশালী এই চার ভাই। ১৯৯৯ সালে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে পরে নতুন দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেন। এরপর থেকেই সিদ্দিকী পরিবারের সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব চলে আসে খান পরিবারের হাতে।
বিভিন্ন সময় নানা কর্মকাণ্ডের জন্য অর্ধশতাধিক মামলা কাঁধে নিয়েও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতেন খান পরিবারের চার ভাই। অবশেষে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় ফেঁসে যান তারা। নিজেদের তৈরি কর্মী রাজা পুলিশের হাতে আটক হয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর থেকে তারা আত্মগোপনে। এই চার ভাইকে দল থেকে বহিষ্কারের জন্য আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসছেন।
তবে সিদ্দিকী পরিবারের বিকল্প হিসেবে এই শক্তির উত্থানকে প্রথম দিকে সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীরা স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু গত দেড় দশকে এই পরিবারের কর্মকাণ্ডে তাদের প্রতি জনগণ হতাশ। পরিবারটি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, মহিলা লীগসহ সব অঙ্গসংগঠন ধীরে ধীরে দখলে নেয়ার পরও সাধারণ নেতাকর্মীদের আস্থাভাজন থাকতে পারেনি। টেন্ডারবাজি থেকে জেলার সব কর্মকাণ্ড তাদের হাতের ছোঁয়া পেতে থাকে। তাদের অতি দাপটেই তারা এখন ক্ষমতাচ্যুত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, যেকোনো সময় দল থেকে বহিষ্কার হতে পারেন প্রভাবশালী এই চার নেতা।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুক ঢাকাটাইমসকে বলেন, “খান পরিবারের এই চার নেতার বিরুদ্ধে থানায় মামলা রয়েছে। পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনেও নাম রয়েছে তাদের। মামলায় জড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই তারা আত্মগোপনে। তাই বর্তমানে কোনো কমিটিতে তাদের রাখা হয়নি। তাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে।”
বহিষ্কারের গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়ে ফজলুর রহমান বলেন, “বহিষ্কারের বিষয়টি কেন্দ্রের। তাদের অবস্থা জেনে কেন্দ্রীয় কমিটি বহিষ্কার করলেও করতে পারে।”
পেছন ফিরে দেখা
নব্বইয়ের দশকে খান পরিবারের তেমন কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল না তেমন প্রভাব বা পরিচিতি। আকস্মিকভাকে খান পরিবারের বড় ভাই আমিনুর রহমান খান বাপ্পী খুন হন দুর্বৃত্তদের হাতে। এর পরই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হতে থাকে বাপ্পীর চার ভাই। ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনে বিভিন্ন পদ পেতে শুরু করেন তারা। শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও টাঙ্গাইল সদরের মেয়র পদে নির্বাচিত হন সহিদুর রহমান খান (মুক্তি), ঘাটাইল আসনের সাংসদ হন আমানুর রহমান খান (রানা), ব্যবসায়ী নেতা হন জাহিদুর রহমান খান (কাকন),
ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি পদটি পেয়ে যান সানিয়াত খান (বাপ্পা)।
এভাবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো চলে যায় খান পরিবারের আয়ত্তে।
সবশেষে ক্ষমতার লোভেই আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমেদকে হত্যা করা হয়। হত্যা মামলার আটক আসামিদের জবানবন্দিতে জানা যায়, ফারুক আহমেদ বেঁচে থাকলে তার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। পদটি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় খুন করা হয় এই মুক্তিযোদ্ধাকে।
অর্ধশত মামলা কাঁধে থকলেও বিগত দিনগুলোতে কাবু হননি খান পরিবারের চার ভাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেয়ার পর থেকেই টাঙ্গাইল জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জেলার সর্বত্র এখন আলোচনার কেন্দ্রে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে আওয়ামী লীগের এমপি আমানুর রহমান খান রানা ও তার তিন ভাই। অতিরিক্ত ক্ষমতার লোভেই এখন ক্ষমতাচ্যুত প্রভাবশালী চার নেতা ফেরারি হয়ে ঘুরছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অর্ধশত মামলা হলেও তার কোনো সফল বিচার প্রক্রিয়া মানুষ দেখেনি। কখনো বাদী ও সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। আবার ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’সরকার নিজেই কখনো তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা তুলে নিয়েছে। ফলে দিন দিন তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি লাগামছাড়া হতে থাকে।
তাদের এই অবাধ গতির মধ্যে প্রথম ছেদ ফেলে মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলা। যদিও এই মামলার বাদী ফারুকের স্ত্রী নাহার আহমেদ তার এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি; কিন্তু খান পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক কর্মীর জবানবন্দিতে উঠে আসে তাদের নাম। হত্যাকাণ্ডের তিন বছর ১৫ দিন পর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। তাতে ওই চার ভাইকে অভিযুক্ত করা হয়।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর জানান, এটি একটি চাঞ্চল্যকর মামলা। তাই এটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেয়া হবে।
আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে- জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ফারুক আহমেদ। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার খুব সম্ভাবনাও ছিল তার। অন্যদিকে পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তিও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস আগে এমপি রানা ও তার তিন ভাই মুক্তি, কাকন, বাপ্পা এবং নাছির উদ্দিন, ছানোয়ার হোসেন ও আলমগীর হোসেন চান ফারুককে হত্যার পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে রানা ও তার ছোট ভাই বাপ্পা তাদের কলেজপাড়ার বাসার কাছে গ্লোবাল ট্রেনিং সেন্টারে আনিসুর রহমান রাজার মাধ্যমে ফারুককে ডেকে আনেন। সেখানে ফারুককে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থিতা থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন বাপ্পা। কিন্তু ফারুক তাতে রাজি হননি। একপর্যায়ে ফারুক কক্ষ থেকে বের হয়ে বাথরুমে যান। বাথরুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথে এমপি রানার ঘনিষ্ঠ কবির হোসেন তাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। এ সময় এমপি রানা দুই মিনিটের মধ্যে সব পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তার কথামতো রাজা, মোহাম্মদ আলী, আবদুল হক, সমীর ও কবির হোসেন ফারুকের মৃতদেহ তারই বাসার সামনে ফেলে রেখে আসেন। সেখান থেকেই তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।
টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম মাহফিজুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত ১৪ জনের মধ্যে আনিসুর রহমান রাজা, মোহাম্মদ আলী, সমীর ও ফরিদ আহমেদ কারাগারে রয়েছে। এমপি রানা ও তার তিন ভাইসহ অন্য ১০ জন্য বর্তমানে পলাতক।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, খান পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে এমপি রানা ও সাবেক পৌর মেয়র মুক্তি দেশেই আত্মগোপন করে আছেন। অন্য দুই ভাই ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন মালয়েশিয়ায় এবং অপর ভাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন।