নিজস্ব প্রতিবেদক । আপডেট: ১:৩৪ পিএম, তারিখ: ২৭ নভেম্বর ২০১৫ইং, শুক্রবার , সর্বশেষ সম্পাদনা ১:৩৪ পিএম
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। কারণ শিক্ষা আলো ছাড়া কোন মানুষ নিজেকে পরিপূর্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত করতে পারে না। আর তাই প্রতিটি দেশের সরকার শিক্ষা আলো সকলের মাঝে পৌছে দিতে কাজ করে থাকে। শিক্ষিত জাতিই যে পারে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আগামীর পথে তা প্রমানিত বহু আগে। এ বিষয়টির কথা বিবেচনা করে আমাদের সরকারও শিক্ষার উপর জোড় দিয়েছে গত কয়েক বছর আগে থেকে। দেশের প্রতিটি এলাকার মানুষ তাদের সন্তানদেরকে যেন শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে পারে তার জন্য স্কুলের সংখ্যা বাড়িয়ে কয়েক গুন করা হয়েছে।
স্কুলে উপস্থিতির হার বাড়াতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। আর এ সকল প্রকল্পের ফলে গ্রামের দারিদ্র মানুষ গুলোও তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছে দিন দিন। বর্তমানে স্কুল গুলোতে উপস্থিতির হার আগের চেয়ে কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের মানুষগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে সন্তানকে শিক্ষিত করার ব্যাপারে। যে ভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটতে শুরু করেছে তাতে করে আগামীতে এ দেশের শতভাগ লোক শিক্ষার আলোতে আলোকিত থাকবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে একটি বিষয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সফলতার পথে বাধা সৃষ্টি করছে আর তা হলো কোচিং বানিজ্যে।
সরকারী ভাবে নীতি মালা করে কোচিং বানিজ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হলোও তা যেন মানছে না কেউ। তাছাড়া এ বিষয়টি দেখার জন্যে যাদের কাজ করার কথা তাদের দেখা মেলে না কোথাও। ফলে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই বর্তমানে কোচিং সেন্টারে ছেয়ে গেছে। আমাদের ঘাটাইলেও তার ব্যতিক্রম নয়।
বর্তমানে ঘাটাইলের বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা সরাসরি বিভিন্ন কোচিং সেন্টারগুলো পরিচালনা করছেন। কোন কোন স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা তাদের নিজের পরিচালনায় কোচিং সেন্টার না চালালেও কৌশলে জড়িত হচ্ছেন কোচিং ব্যবসার সাথে। ফলে স্কুলে পাঠদানের জন্য যে শ্রমটুকু তাদের প্রদান করা দরকার তা তারা দিতে পারছেন না ঠিকমতো। তারা স্কুল কলেজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কোচিং সেন্টারকে। ফলে স্কুল, কলেজে আসা শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘাটাইলের বিভিন্ন স্কুল কলেজ ঘুরে বিভিন্ন ছাত্র/ছাত্রী অভিভাবকদের সাথে কথা বলে যে বিষয়টি আমাদের কাছে ধরা পড়েছে তা হলো স্কুল, কলেজের যে সকল শিক্ষকরা কোচিং কিংবা প্রাইভেটের সাথে জড়িত আছেন তারা শ্রেনী কক্ষে মনোযোগের সাথে পাঠদান করান না। কোন বিষয়ে বুঝতে সমস্যা হলে তা বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করে বোঝানোর কোন চেষ্ঠাও তারা করেন না অথচ কোচিং সেন্টারে গেলে একই স্যার সম্পুন্ন আলাদা ভাবে যতœ সহকারে তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে দেন। ফলে বাধ্যে হয়ে ছাত্রদের স্কুলের স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়।
আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আরো জটিল বিষয় থাকে। যেমন স্কুলের স্যারদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ভাল লেখলেও ভাল ভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়া ছাত্র পরীক্ষার খাতায় অন্য ছাত্রের চেয়ে কম মেধার পরিচয় দিলেও তাকে নাম্বার দেয়া হয় বেশি অথচ ভাল লেখেও কম পাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে অনেকের। এর মূল কারণ কোচিং সেন্টার নাম্বার কম পেলে ছাত্ররা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে আসবে। বার বার সন্তানের পিছিয়ে পড়াকে মানতে না পেরে এক প্রকার বাধ্য হয়ে অনেক বাবা মা তাদের সন্তানকে স্কুলের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ান কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই তাদের উপায় কি হবে ?
আমাদের অনুসন্ধানে ঘাটাইল উপজেলার দেউলাবাড়ীর এম কে ডি আর গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের এক স্কুল শিক্ষকের প্রাইভেট বানিজ্যের তথ্য উঠে এসেছে। তিনি সকাল ৬টা থেকে প্রাইভেট পড়াতে শুরু করেন। স্কুল শুরুর আগ পর্য্যন্ত দুইটা ব্যাচ পড়ান যাতে ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা ত্রিশ জনের উপরে। আবার স্কুল ছুটির একঘন্টা পর থেকে সন্ধ্যা পর্য্যন্ত তিন ব্যাচ পড়ান যাতে ছাত্র/ ছাত্রী সংখ্যা আনুমানিক ৫৫ জনের মতো। সন্ধ্যার পর থেকে রাত্রি নয়টা পর্যন্ত তিনটা প্রাইভেট পড়ান ছাত্রদের বাসায় গিয়ে। প্রাইভেট এবং কোচিং থেকে তার আয় ৯০,০০০ হাজার টাকার বেশি। এমন অনেক স্যারের তথ্য আমাদের জানিয়েছেন বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা। যদি একজন স্যার এতটা সময় নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তাহলে স্কুলে তিনি মনোযোগী না হতে পারলে তার দোষ দেয়া কি ঠিক হবে আপনারাই বলুন। এতটা সময় অন্যত্র ব্যয় করে তারা যে স্কুল, কলেজে নিয়মিত আসেন এর জন্যই আমাদের সরকার তাদের মাসে মাসে বেতন দিয়ে যাবেন এটাইতো সঠিক।
কোচিং সেন্টারে পড়তে না আসার জন্যে অনেককে আবার শিক্ষকদের প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে এমন ঘটনাও জানা গেছে। তবে এই যদি হয় অবস্থা তাহলে আমাদের দেশের সাধারন মানুষের পক্ষে শিক্ষা গ্রহন কিভাবে হবে। যাদের টাকা আছে তাদের না হয় কোন সমস্যা হবে না কিন্তু যাদের আয় সীমিত তাদের কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছেন ?
আমাদের শিক্ষানীতিতে উল্লেখ আছে কোন স্কুল, কলেজের আগ্রহী শিক্ষার্থীদের বা অভিভাবকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান গন অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটান এলাকাতে সর্বচ্চো ৩০০ টাকা, জেলা শহরে ২০০ টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে ১৫০ টাকা করে নিবেন। এছাড়া কোন শিক্ষক তার নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে দৈনিক বা প্রতিদিন অন্য যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমিত সংখ্যক (১০ জনের বেশি নয়) শিক্ষর্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন।
এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে লিখিতভাবে ছাত্র/ছাত্রীর তালিকা (রোল, শ্রেনী উল্লেখ সহ) জানাতে হবে। কোন শিক্ষক কোন কোচিং সেন্টারের সাথে জড়িত হতে পারবেন না এবং ১০% পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং সহায়ক কর্মচারীদের ব্যয় বাবত রেখে বাকিটা অতিরিক্ত ক্লাসের কাজে নিয়োজিত শিক্ষকদের মধ্যে বন্টন করে দিতে হবে।
আমাদের ঘাটাইল/প্রতিনিধি/শুক্র-১ম/কেআই/১১