২০০৯ সালের কথা। প্রথমবারের মত একজন সাংবাদিক দেখেছিলাম, তখন দেখেছি তাঁকে মানুষ অনেক সম্মান করছে। সে সম্মান দেখে লোভ আর সামলাতে পারলাম না। শুরু করলাম সাংবাদিক হওয়ার যুদ্ধ। ঠিক অদ্ভুত একটা নেশা কাজ করেছিল আমার মধ্য।নেশার টানে শুধু সাংবাদিক হওয়ার পিছনে ছুটলাম। অনেক কিছু ভাবতে গিয়ে মনে প্রশ্ন আসে, আমি যা জানি ও বুঝি তাতে কি আমি সাংবাদিক হতে পারবো? আসলে তখনও জানতাম না আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মফস্বল সাংবাদিক হতে হলে কোন যোগ্যতা এমনকি এসএসসি পাসেরও দরকার হয় না। হঠাৎ একদিন চাকরির খবর পত্রিকায় দেখলাম মাসিক বিশ্ববার্তা নামের একটি পত্রিকায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংবাদিক নিয়োগ চলছে। কি আর করা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! জীবনের বিস্তারিত লিখে এক খানা পত্র পাঠালাম। গুনে গুনে ছয় দিন পরেই আমার নামে ডাকযোগে একটি চিঠি চলে এল। অনুভুতিটা বোঝাতে পারবো কিনা জানি না। জীবনের প্রথম আমার নামে কেউ চিঠি পাঠালো, তাও আবার সাংবাদিক হওয়ার চিঠি। চিঠিটা ফ্রি পেলাম। খামের ভিতরের চিঠিটা পড়ে জানলাম আমার জন্য পরিচয় পত্রের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া একই খামে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ বিষয়ে একটি বই পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বইটি পেতে হলে ৫৮০ টাকা পাঠাতে হবে তাদের কাছে। নইলে বইটি আবার ফেরত যাবে আর পরিচয় পত্র যাবে ভেস্তে। সাথে সাথে টাকা দিয়ে বইটি আমার করে নিলাম, আর অপেক্ষা করতে শুরু করলাম কবে পাবো পরিচয় পত্র। নিজেকে কখন মনে করবো আমি একজন সাংবাদিক। ঠিক আট দিন পর পরিচয় পত্র পেলাম। তখন কি যে আনন্দ, সব কিছু যেন আমার মনে হচ্ছে। সকল ক্ষমতা যেন বলে উঠলো তারা শুধুই আমার, আর কারো নয়। ঘুমাতে গেলে, খেতে গেলে, ঘুরতে গেলে, সব
জায়গাতেই বসে এক নজর দেখতে থাকি পরিচয় পত্রটি। এবারতো সাংবাদিক হলাম। এর মধ্যে কেটে গেলো এক বছর। অবাকও হলাম কোন দিন সংবাদ পাঠাতেও বলেনি তাঁরা। তবে সংবাদ না পাঠানোর ফলে একদিকে ভালই ছিলাম। এবার আবার সখ হলো দৈনিক পত্রিকার বড় সাংবাদিক হবো। কিন্তু বড় সাংবাদিক হতে হলে সংবাদ লিখতে হয়। অনেক কিছু জানতে হয়। এবার মিশতে শুরু করলাম জেলার অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথে। তাঁদের সাথে মিশে বিপদ যেন বেড়েই চলছে। তাঁদের সাথে মিশে সাংবাদিকতা বিষয়ে যতো জানছি আমার ক্ষমতাও যেন ততো কমে আসছে। ঠিক তার কয়েকদিন আগেই ইউপি নির্বাচনে আমার পরিচয় পত্রটি পকেটে নিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকে পড়লাম। সেদিন ভাগ্য ভাল ছিল কোন ম্যাজিস্ট্রেট আমার সামনে পড়েনি। পড়লে হয়তো সাংবাদিক হওয়ার
মজাটা হাড়ে হাড়ে টের পেতাম। কিন্তু পরে জানলাম সাংবাদিকতার পরিচয় পত্র দিয়ে নির্বাচনের ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করা যায় না, তার সাথে আরো কিছু লাগে। প্রথমেই বলছিলাম আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মফস্বল সাংবাদিক হতে এসএসসি পাসেরও দরকার হয় না।
আসলে সাংবাদিকতা কি তা একটু আধটু জেনে ও বুঝে মানলাম আমি সাংবাদিক হতে পারিনি, সাংবাদিক জাতির জন্য আমি একটা সাংঘাতিক বিপদ তৈরি হয়েছি। জেলার অনেক সাংবাদিকদের সাথে মিশে আরো একটু জানলাম এ দলে শুধু আমি একা না আমার
দলে অনেক সদস্য আছে। যাঁদের মধ্যে অনেকেই আবার ফকিরাপুল সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। কেউ না বুঝে থাকলে বুঝিয়ে বলছি,
ফকিরাপুল সাংবাদিক কাকে বলে। তার আগে জেনে নিই ফকিরাপুল সাংবাদিকদের আয় বাণিজ্যের কথা। তাঁরা যে কোন কাজে গেলে বেশ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে যান। যে কোন সমস্যা সমাধান করতে দিন মজুরদের মত তাঁরা মানুষ চুক্তিতে নিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বাল্য বিয়ে বন্ধ করতেও তাঁরা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। পরে জানতে পারলাম সেখানেও নাকি তাদের বাণিজ্য আছে। যাই হোক এ সব সাংবাদিকদেরও বা দোষ কি বলেন, তাঁদের অনেকের অফিসেও নাকি এ আয়ের কিছু অংশ দিতে হয়। নইলে সাংবাদিকতার লাইসেন্স
থাকে না! এবার জানবো ফকিরাপুল সাংবাদিক: যাঁরা রাজধানী ঢাকার পল্টন ফকিরাপুল গেছেন তাঁদের হয়ত অনেকেই দেখেছেন, অলি-গলির মধ্যে শত শত পত্রিকার বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়। আমিও গেছিলাম সেখানে, দেখেই বুঝে ফেলেছি এই বাণিজ্যই
তাহলে চলছে আমার জেলায়। কিন্তু ওই সব পত্রিকার অফিসে কখনো উঠিনি বিধায় সেখানের কার্যক্রম সম্পর্কে বলতে পারছি না। তবে শুনেছি মানিব্যাগ নিয়ে সেখানে উঠলেই নাকি সাংবাদিক হওয়া যায়। দুঃখের বিষয় হলো এখন ২০১৬ সাল। এখনো পরিবর্তন হয়নি মফস্বল সাংবাদিকদের চরিত্র। পরিবর্তন হয়নি ফকিরাপুল সহ বহু আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা কর্তৃপক্ষের। যদি মফস্বল সাংবাদিকদের বেতন ভাতাই দিতে না পারেন তবে পত্রিকা বন্ধ করে দেন না কেন?। যদি চান্দাবাজি আর ধান্দাবাজি করে জীবনটা চালাতে হয়
তবে এ পেশায় আসবেনই বা কেন? লেখাটি পড়ার পর কেউ কেউ হয়তো আমার প্রতি রাগ করবেন, হয়তো কেউ আবার গালিও দিবেন। তাঁদের কাছ থেকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে ইচ্ছে করছে, এত পেশা থাকতে সাংবাদিক হতে এলেন কেন? যদি এসেই পড়েছেন, তবে কেনই বা ব্যবহার হচ্ছেন ওই সব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা কর্তৃপক্ষের হাতে? আসলে এ সবকিছুর মূলে দোষটা কার? উত্তরগুলো পাওয়ার আশায় রইলাম। আর অপেক্ষায় রইলাম, এমন একদিন আসবে যেদিন মফস্বল সাংবাদিকরা তাঁদের ন্যায্য
পাওনা বুঝে নিবে আর ওইসব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মৃত্যু ঘটবে।
লেখক: মোঃ খায়রুল ইসলাম
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
দৈনিক খোলা কাগজ
ই-মেইল: khyrulislam2@gmail.com



