গল্পটা খুবই সাদামাটা। কীভাবে খবরের ফেরিওয়ালা হলাম। ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ঝোঁক ছিল আমার। ১৯৮৯ সালের দিকে জামালপুর জিলা স্কুলে থাকতে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আমার কবিতা লেখা শুরু।
প্রথম প্রথম কবিতা লিখে নিজেই পড়তাম আর বিছানার নিচে আর্কাইভে জমিয়ে রাখতাম। মাঝে মাঝে স্কুলব্যাগের পকেটে রাখা টুকরো কাগজে লেখা কবিতা টিফিন পিরিয়ডে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসডিও ঘাটে বসে সহপাঠিদের শুনাতাম। একসময়ে লেখাটা নেশায় পরিণত হলো।
অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার আগেরদিন পড়ার টেবিলে বসে ডায়েরিতে কবিতা লিখছি। সেজ ভাই (আমি দাদাভাই বলে ডাকি) পেছন থেকে এসে দেখছেন আমি কবিতা লেখায় মগ্ন। দেখেই অগ্নিমূর্তি হয়ে মারধর শেষে ৩টি কবিতার ডায়েরি ইটের সঙ্গে রশিতে বেঁধে জানালা দিয়ে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। মারখেয়ে কষ্ট পায়নি, কষ্ট পেয়েছিলাম কবিতার ৩টি ডায়েরির জন্য। আমার লেখা অনেক কবিতা সেদিন পুকুরের জলে সমাধি হয়েছিল। অনেক কেঁদেছি হারিয়ে যাওয়া কবিতার শোকে।
তারপর রাগ, ক্ষোভ ও অভিমানে অনেক দিন কবিতার সাথে দেখা হয়নি। বিরহপর্ব চলেছে কয়েক বছর। অবশেষে কষ্ট ভুলে আবার ফিরে এলাম কবিতার ভালোবাসার টানে। টুকটাক লিখতে শুরু করলাম। সেসময় লিটলম্যাগ, রাঙা পলাশসহ বার্ষিকী ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়।
এক সময় ছাত্ররাজনীতিতে জড়ালাম। জেলা ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক থাকাকালে প্রেসরিলিজ নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় যাওয়া-আসা ছিল আমার রুটিন বাধা কাজ। ফলে অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। পত্রিকা অফিসগুলোতে গিয়ে দেখতাম সাংবাদিকরা নিউজ লিখছে, ঘটনার খবর পেয়ে দৌড়ে যাচ্ছে- সবমিলিয়ে সংবাদচর্চার দৃশ্যপট আমাকে টানতো। এ পেশায় প্রবেশে ইচ্ছা জাগতো কিন্তু প্রকাশ করার সাহস পেতাম না। একবার সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে মেটাতে গিয়ে ৩শ টাকা ঠকেছিও।
পত্রিকায় ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছিল, দৈনিক স্বাধীন পত্রিকায় সাংবাদিক নিয়োগ করা হবে। সাংবাদিক শেখার প্রশিক্ষণ গাইড বাবদ ৩শ টাকা পত্রিকা অফিসের ঠিকানায় পাঠানোর আহ্বান। যথারিতি বড় বোনের কাছ থেকে ৩শ টাকা নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিছুদিন পর ডাক পিয়ন হাতে ধরিয়ে দিল লম্বা চওড়া খাকি খাম। খুলে দেখি সাংবাদিকতা শিখুন, সংবাদ লেখার কৌশল, সংবাদ কাঠামো ইত্যাদি লেখা ১৫/২০ পিস ফটোস্ট্যাট কাগজ সাথে আরেকটি আহ্বান ৩ হাজার টাকা পাঠালে আইডি কার্ড ও ক্যামেরা পাঠানো হবে। এসব দেখে আমার চোখতো চড়কগাছ। থাক, ৩শতেই ইতি টানলাম।
এরপর স্থানীয় পত্রিকার দু’একজন সম্পাদকের কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করে সাড়া না পাওয়ায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ১৯৯৯ সালের দিকে হঠাৎ আমার বাসার সামনে মিয়াপাড়ার চামড়াগুদাম মোড়ে পল্লীকণ্ঠের সম্পাদক নুরুল হক জঙ্গী দাদা হাজির। আমার পূর্ব পরিচিত। আলাপচারিতার এক ফাঁকে তার পত্রিকায় কাজ করার আহ্বান জানালো।
শহরের ফিসারিমোড়ে সাপ্তাহিক পল্লীকণ্ঠ অফিসে প্রথমদিন যেতেই জঙ্গী দা বললেন, তোমার বাসায় ক্যামেরা আছে?
আমি বললাম, ইয়াসিকা ক্যামেরা আছে।
-যাও বটতলা মোড়ে রেললাইনের পাশে জমি দখলের হিড়িক পড়েছে, ছবিসহ নিউজটি করে আনো।
বাইসাইকেল চালিয়ে গেলাম ঘটনাস্থলে। গিয়ে দেখি ২৫/৩০টি চালাঘর তুলছে দখলকারীরা। কেউ চাল লাগাচ্ছে, কেউ বাঁশের বেড়া লাগানোয় ব্যস্ত। বাদ যায়নি মসজিদের ইমামও। দখলের চিত্রে হঠাৎ দেখি বটতলা ঈদগাহ মাঠ মসজিদের ইমাম সাহেব কাছা মারার মতো পাঞ্জাবী কোমরে বেঁধে টানা দিয়ে দখলকৃত ঘরের চাল বাঁধছেন। ক্যামেরার এঙ্গেলে ইমাম সাহেবকে রেখে সারি সারি দখলীয় চালাঘরের দৃশ্যে ক্লিক। ছবিসহ রেলের জমি দখল শিরোনামে রিপোর্ট লিখে পত্রিকা অফিসে জমা দিলাম। লেখালেখি ও নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল তাই আমার রিপোর্টে কাঁচি চালাতে হয়নি জঙ্গী দার। প্রথম পাতায় রিপোর্টটি প্রকাশিত হলো। প্রথম নিউজেই বাজিমাত। অনেকে বিরোধিতাও করেছে। ধ্যানেজ্ঞানে শুরু করলাম সাংবাদিকতা। কখন যে গভীরে গিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে বিষ বুঝতেই পারিনি।
সাংবাদিকতা পরিণত হলো নেশায়। নেশা থেকে পেশা। তারপর সাপ্তাহিক জনক, দৈনিক জনবাংলা হয়ে প্রথম ঢাকার পত্রিকায় কাজ করি সাপ্তাহিক পোস্টকার্ডে। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন মজিবুর রহমান আর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন মোতালেব জামালী। তারপর একে একে দৈনিক খবরপত্র, আজকালের খবর, নয়াদিগন্ত, দিগন্ত টেলিভিশন, স্টার মেইল, রাইজিং বিডি বর্তমানে পরিবর্তন ডটকম ও বাংলাদেশের খবর, নিউজ ম্যাগাজিন প্রিয়দেশ এ কাজ করছি। দায়িত্ব পালন করছি জনদ্বীপ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। যোগদান করবো বাংলাদেশ জার্নালে। এছাড়াও জামালপুর প্রেসক্লাবে তিনবার যুগ্ম সম্পাদক ও চারবার কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে দায়িত্বপালন করছি।
পেশাকে ভালোবেসে দিনরাত পরিশ্রম করেছি। নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পিআইবি, গণমাধ্যম ইনিস্টিটিউট ও ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) থেকে স্বল্পকালীন ও দীর্ঘ মেয়াদী রিপোর্টিং এবং ফটোগ্রাফির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। একপর্যায়ে গণমাধ্যম এনজিও এমএমসির জামালপুর জেলা প্রদায়কের দায়িত্ব পালন করি। এখনও সুযোগ পেলেই সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণে অংশ নিই। এ পেশায় শেখার শেষ নেই। দেখতে দেখতে পেশাতে ১৯ বছর কাটিয়ে পা রাখলাম ২০ বছরে। এখনো শেখার অনেক বাকি। খবর ফেরি করেই যাচ্ছে সময়, কাটছে জীবন। আমি যে এক খবরের ফেরিওয়ালা।
লেখক: শওকত জামান, গণমাধ্যমকর্মী।