মো. মাসুম মিয়া, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) : 'আজ আমাকে আপনারা যে সম্মাননা দিচ্ছেন, আসলে এটা পাওয়ার যোগ্য আমার মা।' জয়িতা হওয়ার পর নিজের অনুভূতির কথা এভাবেই জানান মারুফা নাজনীন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতিতে কর্মরত আছেন। টাঙ্গাইল জেলা পর্যায়ে জয়িতা সম্মাননা অনুষ্ঠানে মারুফা জানান তার জীবনের কঠিন বাঁকের কথা। মা সেদিন কানের একজোড়া দুল বিক্রি করে নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ফি না দিলে মারুফার আজ এ পর্যায়ে আসাই হতো না।
এলাকায় মারুফা পরিচিত লিপি নামে। বাবা আখতার হোসেন ও মা ফরিদা ইয়াছমিন। বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পৌর এলাকার শহীদ আবদুর সাত্তার রোডে। খুব সাধারণ পরিবারের তিন ভাইবোনের মধ্যে মারুফা সবার বড়। বাবা থেকেও নেই। আরেকটি বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছেন। দু-তিন মাস পর বাবা একবার তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। কোনো সময় আসতেনও না। বাবা কিছুদিন পরপর দুইশ' করে টাকা পাঠাতেন। তা দিয়ে ছোট বোনের এক প্যাকেট দুধ আর এক কেজি চিনি কিনলে চাল কেনার টাকা থাকত না। যেখানে চাল কেনারই টাকা নেই, অন্য বাজার করার কথাটাও অবান্তর।
মারুফা বলেন, অনেক সময় শুধু লবণ দিয়ে ভাত খেয়ে দিন পার করতাম। নবম শ্রেণিতে উঠে পড়াশোনা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। টাকার অভাবে রেজিস্ট্রেশন করতে পারিনি। এক বছর লেখাপড়া বন্ধ ছিল। পরের বছর মা তার কানের একজোড়া দুল বিক্রি করে অতি কষ্টে ঘাটাইল এসই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতায় বোর্ড থেকে রেজিস্ট্রেশন করে আনেন। স্কুল-বাড়ি যেখানেই থাকি, সম্বল বলতে একটিমাত্র জামা। মা সেলাইয়ের কাজ জানতেন। সে সময় এক লোকের কাছ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা ধার নিয়ে কিস্তিতে একটা সেলাই মেশিন কেনেন। এরপর রান্নাসহ ছোট দুই ভাইবোনের দেখাশোনার কাজ আমার ওপর এসে পড়ে। মা শুরুতে বাজারের ব্যাগ সেলাই করতেন। প্রতি ব্যাগে পেতেন ২০ পয়সা। তারপর এলাকায় পরিচিত হলে কাপড় সেলাই শুরু করেন।
মারুফা বলেন, এভাবেই চলতে থাকে আমাদের সংসার। পড়ালেখার পাশাপাশি রাত জেগে মায়ের কাজে সাহায্য করতাম। এরই মধ্যে এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় ভালো ফল করি। শিক্ষকরা আশাবাদী হয়ে ওঠেন। ইংরেজি স্যার খাজা ফেরদৌস বাসায় এসে এক রিম খাতা ও ১০টা কলম উপহার দেন। সেই সময় স্যার বলেছিলেন, 'তোর কাছে একটাই চাওয়া, শুধু ভালো একটা রেজাল্ট এনে দিবি।' স্যার সবসময় আমার খোঁজ নিতেন। আমি সারা জীবন স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ। এসএসসি পাস করার পর ঘাটাইল জিবিজি কলেজে ভর্তি হই। কলেজে বেতন দিতে হতো না। স্যারেরা আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন ফ্রি।
মারুফা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আমার হবে না, তাই ঘাটাইলেই বিএসসি করব- এমন সিদ্ধান্ত নিলাম। হঠাৎ একদিন মা বললেন, তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে। মায়ের কথামতো পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সুযোগ পেয়ে গেলাম ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি প্রাইভেট পড়াতাম। ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিই। চূড়ান্ত ফলে পুলিশ প্রশাসন (এএসপি) পদে টিকে যাই। এবার মারুফার চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু। সেটি আর গড়িয়ে পড়তে দিলেন না, নিজেকে সামলে নিলেন। সংসার জীবনে মারুফা ব্যবসায়ী স্বামী মুজিবুল কাইয়ুম আকরাম ও একমাত্র সন্তান শায়ানকে নিয়ে সুখেই আছেন। মা ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, আমাদের প্রতি আল্লাহর দয়া ছিল। আমার পরিশ্রম আজ সার্থক।
সংগ্রামী এই জননীর আরেক মেয়ে নুসরাত জাহান ইভা পড়েন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে। একমাত্র ছেলে ইফতেখাইরুল হাসান মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র।


