রবিউল আলম বাদল, ভোরের কাগজ: উত্তর টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, কালিহাতী, ভূয়াপুর, গোপালপুর, মধুপুর, ধনবাড়ী উপজেলার টপটেরর মাদক সম্রাট, বিশিষ্ট জুয়ারু, নারী ব্যবসার মহাজন, সুদ ও ঘুষখোরের কথিত সভাপতি, দুর্নীতির মহারাজা, সন্ত্রাসের গডফাদার, সকল অপরাধের হোতা ঘাটাইল উপজেলার দিঘলকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। তিনি জেলার উত্তর এলাকায় মাদক জুয়া, নারী সুদ, ঘুষ প্রতারনা ও দুর্নীতির ফাঁদ তৈরি করে এলাকায় শত শত পরিবারকে নিঃস্ব ও ধ্বংস করে নিজে সম্পদের পাহাড় গড়লেও তিনি রয়েছেন ধরাছোয়ার বাইরে। তার বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে ঘাটাইল, কালিহাতী ও টাঙ্গাইল থানায় মাদক, জুয়া, নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সহ ১০ থেকে ১২টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। মানুষ তার ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও অনেকে গোপনে আইনের কাছে তার শাস্তি দাবী জানিয়েছেন।
গত দুই মাসের অনুসন্ধানে ভূক্তভোগী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, মাতাব্বর, এলাকার যুবক ছাত্র বৃদ্ধ ব্যবসায়ী শিক্ষক শ্রমিক দিনমজুর সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, দিঘলকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সকাল বেলায় ঘুম থেকে জাগে জুয়ার টাকা হাতে নিয়ে। দুপুরে ভাত খায় সুদ ও ঘুষের টাকা দিয়ে এবং রাতে ঘুমাতে যায় মাদকের টাকা হাতে নিয়ে। এভাবে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বে-আইনী কর্মকান্ড চালিয়ে আট বছরে শূণ্য থেকে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অনুসন্ধানে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।
ভূক্তভোগী ও এলাকাবাসী জানায়, চেয়ারম্যান নজরুল উত্তর টাঙ্গাইলের মাদক, জুয়া নারী, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের গডফাদার। তার ইশারায় এলাকায় সকল অপরাধ সংগঠিত হয়ে থাকে। ২০০৪ ও ২০১৭ সালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফায়দা লুটতে কাশতলা ও নাটশালা গ্রামের মধ্যে মারামারি সৃষ্টি করে শতাধিক দোকানপাট ও হাট ভাংচুর ও লুটতরাজ করে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তাছাড়াও হামিদপুর গ্রামের রাজ্জাক খার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে লুটতরাজ করে চেয়ারম্যান নজরুল। শেষে নজরুলকে আসামী করে একাধিক মামলা হয়।
তার অতীত কর্মকান্ডের ফলে উপজেলার দেউলাবাড়ি বাজার থেকে কালিহাতী ব্রীজ পর্যন্ত আশে পাশের মানুষ তার ভয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকে। জানা যায়, নজরুল যেমন উশৃংখল তেমনি বেপরোয়া। সে গায়ের জোরে আইনকেও তোয়াক্কা করে না।
২০১৪ সালে জামায়েত বিএনপির আন্দোলনের সময় দেউলাবাড়ি থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত গাড়ি পোড়ার নেতৃত্ব দেয় চেয়ারম্যান নজরুল। তার নামে পাকুটিয়া গাড়ী পোড়া, বানিয়াপাড়া গাড়ী ভাঙ্গা, গুণগ্রাম গাড়ীপোটা, কদমতলী হুন্ডা পোড়া, হামিদপুরে গাড়ী পোড়া ও টাঙ্গাইলে নাশকতার মামলা রয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের লোক হয়েও তার ইউনিয়নে সরকারী দলের ইউপি সদস্যদের কাজ না দিয়ে উল্টো তাদের কোনঠাসা করে রাখে। ফলে ২০১৭ সালের টিক্কা মেম্বারের নেতৃত্বে সকল ইউপি সদস্য তার বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অনাস্থা দিলেও তিনি ক্ষমতার বলে আজও রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
হামিদপুর বাজারে একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, নজরুল এলাকায় নাম করা অপরাধ জগতের হোতা। এমন কোন অপরাধ নাই যা তিনি না করে থাকেন। তিনি মাদক বিক্রি থেকে শুরু করে জুয়ার ব্যবসা, সুদের ব্যবসা, ঘুষের ব্যবসা, নারীর ব্যবসা, ছাড়াও প্রতারনা ও দুর্নীতি করে নিজে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। আট বছর আগেও যার লবন আনতে পান্তা ফুরাত, সে আজ নাটশালা গ্রামে দুইতলা পাকা বাড়ীর মালিক। কালিহাতী সদরে জমি ক্রয় করে একতলা রাজপ্রাসাদ তৈরি করে সেখানে বসবাস করছেন। তাছাড়াও তার রয়েছে ময়মনসিংহের বাসা, ঢাকা আশুলিয়ায় বাসা, সাভারে ব্যবসা, পাবনায় পেট্রোল পাম্প, কালিহাতীতে একাধিক রাইচমিল, হামিদপুরের একাধিক রাইচমিল ও ইটভাটা। উত্তরবঙ্গে একাধিক গাড়ী, হামিদপুর কবিরের বাসা ও বাবুল সাহার ব্যাটারীর দোকানে জুয়া খেলা, শতাধিক মাদকের ডিলারের নিকট থেকে টাকা আদায় করা ছাড়াও প্রায় ২০ কোটি টাকা সুদ ব্যবসা এক হাতে পরিচালনা করে আসছে।
জানা যায়, চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রতারকের বড় ভাই, তিনি গাছের শিকর কেটে উপরে পানি ঢালে। তিনি একদিকে গোপনে এনজিওর মাধ্যমে ভূয়া সার্টিফিকেট ক্রয় করে এলাকায় শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান বলে প্রচার করে, অপরদিকে তিনি জুয়া, মাদক, নারী ফাঁদে যুবসমাজকে ধ্বংস করে তাদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে।
কালিয়াগ্রাম, সালেঙ্গা ও হামিদপুর গ্রামের একাধিক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, চেয়ারম্যান নজরুলের মতো এতো বড় মাদক সম্রাট টাঙ্গাইল জেলায় দ্বিতীয় জন নাই। তার যতগুলি মাদকের ডিলার রয়েছে কোন কোন ইউনিয়নে ঐ পরিমান লোক বসবাস করে না।
তারা আরও জানায়, নাটশালা গ্রামের শাজাহান তালুকদারের ছেলে মনিরুজ্জামান ওরফে মনির মেম্বার এবং একই গ্রামের বেল্লাল হোসেনের ছেলে রুবেল এরা উভয়েই মাদকে বড় ডিলার এবং চেয়ারম্যান নজরুলের প্রধান সহযোগী। বর্তমানে মনির মেম্বার পলাতক থাকায় তার ব্যবসা পরিচালনা করছে মনির মেম্বারের স্ত্রী এবং চেয়ারম্যান নিজেই।
মনির এবং রুবেল এর মতো উপজেলায় আরও মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে তারা হলো নাটশালা গ্রামের ময়েজ মিয়ার ছেলে মুক্তার আলী, ভোলা মিয়ার ছেলে কিসলু, সুরুজ আলীর ছেলে কবির হোসেন, হায়দর আলী স্ত্রী বেদেনা (বর্তমান ঠিকানা-হামিদপুর) কালিয়াগ্রামের হাবু মিয়ার ছেলে ইব্রাহিম, একই গ্রামের আন্তাজ আলীর ছেলে রাজ্জাক ওরফে কানা , জোতনসর গ্রামের বাছেদ মিয়ার ছেলে রঞ্জু, নজুনবাগ গ্রামের ফরহাদ ও শিপন, কোকডহরা গ্রামের শুকুর, ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের মাহতাব উদ্দিনের ছেলে আতিক, ধোপাজানী গ্রামের ফজলু তালুকদারের ছেলে মনি মেম্বার, একই গ্রামের করিমের ছেলে মিজানুর রহমান মিঠু, হবিবরের ছেলে কালাম, বেলদহ গ্রামের মিন্নাত আলীর ছেলে জাকির, একই গ্রামের সাবিব্বার হোসেন, হামিদপুর গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে হারুন ও মেয়ে মনি, খালেক মিয়ার ছেলে বারেক, হুমায়ুন, আশরাফ, গারট্ট গ্রামের মৃত-জুলহাস মেম্বারের ছেলে আলমগীর হোসেন বাদশা, একই গ্রামের জাহাঙ্গীর, কাশতলা গ্রামের খলিল ড্রাইভারের ছেলে আরশেদ (তার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে সবাই মাদক বিক্রি করে) আঠারদানা গ্রামের বাহাদ আলীর ছেলে রউফ, মোদি মিয়ার ছেলে আলাল, দেলোয়ারের ছেলে মনি, বাগুনডালী গ্রামের হাফিজ উদ্দিনের ছেলে ফরহাদ ও রাজু, (রাজুর বর্তমান ঠিকানা মিলকুড়িয়া) মাইজবাড়ি মৃত খালেকের ছেলে হিরা মেম্বার, পুরুলী মাইজবাড়ী গ্রামের মৃত আবুল পুলিশের ছেলে রঞ্জু, একই গ্রামের মীর বাদশাহ এর ছেলে জুয়েল, ওমর আলীর ছেলে এনামুল, মৃত-হাসান সরকারের ছেলে মালেক সরকার, ওমর আলীর ছেলে মিলন সহ এরকম ৭০ জন মাদকের ডিলার রয়েছে। চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম তাদের সকলের গডফাদার।
চেয়ারম্যান এসব মাদকের ডিলারের কাছ থেকে সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক হিসেবে মাসওয়ারা নিয়ে প্রতি মাসে আয় করে প্রায় কোটি টাকা। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকের নামেই ৫/১০/২০টি করে মাদক মামলা রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের ১০/২০ বার আটক হয়েও আইনের ফাক ফোকরে ছাড়া পেয়ে পুনরায় চেয়ারম্যানের সহযোগীতায় মাদক ব্যবসা করে আসছে।
বাগুনডালী মাইজাবাড়ী গ্রামের এক মাদক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যান নজরুলকে চাঁদা না দিয়ে কেউ মাদকের ব্যবসা করতে পারে না। যারা টাকা দেয় না তারাই বার বার পুলিশের হাতে আটক হয়। যারা চেয়ারম্যান নজরুলকে সাপ্তাহিক বা মাসোয়ারা নিয়মিত দেয় তারাই আটকের ভয় না করে অনায়াসে মাদক বিক্রি করে আসছে।
হামিদপুর এলাকার এক ড্রাইভার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায় নজরুল (চেয়ারম্যান) আড়ালে তার নিজস্ব লোক দিয়ে হামিদপুর পেট্রোল পাম্পের দ্বিতীয় তলায় কালো গ্লাসের ভেতরে বসে গোপনে নিজেই হিরোইন ও জুয়ার ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এই হিরোইন বিক্রির দায়ে ২০১৪ সালে চেয়ারম্যান সহ তার ব্যবসার সহযোগী বাদে পারশী গ্রামের রহিমের নামে ১ কেজি হিরোইন বিক্রির দায়ে মামলা দেয় ঘাটাইল থানা পুলিশ। সে মামলায় চেয়ারম্যান নজরুল হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলেও আঃ রহিম তিনমাস হাজত বাস করে।
এসব অপরাধের বিষয়ে দিঘলকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এতকিছু করিনা, মানুষ না জেনে আমার নামে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।
পুলিশ কেন আপনার নামে মাদক ও জুয়ার মামলা দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশ প্রথমে আমাকে সন্দেহ করেছিল পরে ঠিক হয়ে গেছে।
চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মাদক, জুয়া সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ঘাটাইল থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মাকসুদুল আলম বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না।
মাদক, জুয়া, সন্ত্রাসী দমন বিষয়ে ঘাটাইল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ আবু ইউসুফ আব্দুল্লাহ তুহিনের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে জঙ্গি দমন হয়েছে মাদকেও দমন করা হবে। তবে ঘাটাইল উপজেলায় যত বড় মাদক সম্রাট, জুয়ারু, ঘুষখোর ও সন্ত্রাসী থাকুক না কেন তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।