চির পুরাতন সূর্যটা প্রতিদিনি চির নতুন হয়ে জন্ম নেয় পৃথিবীতে। ঘোষনা করে প্রতিদিন চির নতুন সংবাদ। পৃথিবীর প্রতি তার অমোঘ ভালবাসার কারণেই আবার ফিরে আসতে হয় তাকে। মানুষও এর ব্যাতিক্রম নহে। মানুষের ভালোবাসা হচ্ছে অনাদি-অনন্ত হৃদয় থেকে হৃদয়ের খবর জানার অশান্ত মানবমন চির ব্যাকুল। আর এই ব্যাকুলতা থেকেই সৃষ্টি হয় এক নতুন অধ্যায়ের।
কোন সৃষ্টিই দিন-ক্ষণ মাস মেনে চলে না, চলতে পারে না। আজ যে শিশুটির জন্ম হলো, সৃষ্টি রহস্যের সন্ধানে আরও দশ মাস এগিয়ে যেতে হবে। তারপরও সঠিক জবাব সুকঠিন। আর হ্যাঁ ঘাটাইল প্রেস ক্লাব সর্ম্পকেও এ কথাটি ব্যাতিক্রম নহে, কেননা জন্মের আগেরও একটি ঐতিহাসিক পটভূমি থাকে এবং থাকবে। অনুরুপ প্রেক্ষাপটে আজকের ঘাটাইল প্রেস ক্লাব জন্মের পটভূমিতে যতদূর আচঁ করা যায় তা হচ্ছে- ঘাটাইল প্রেস ক্লাবের চিন্তা চেতনার উন্মোস ঘটে ঊনিশ’শ আশি শতকের দিকে খুব কম সংখ্যক সাংবাদিক থাকলেও সাহিত্যিক, কবি ও বুদ্ধিজীবির খুব একটা অভাব ছিল না। মূলত ঃ অভাব ছিল সংগঠকের এবং সংগঠনের। ষাটের দশকের “জাগরণী সাহিত্য চক্র” নামে একটি সাহিত্য সংগঠন ছিল। অনেক পরে ‘বংশাই’ তারও পরে ‘অরুপ সাহিত্য গোষ্ঠী’ নামে সংগঠনের জন্ম হয়্ কিন্তু প্রেস ক্লাব সম্পর্কে ভাববার অবকাম তখনও সৃষ্টি হয়নি। আশির দশকে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ মতিয়ূর রহমান ঘাটাইলে একটি প্রেস স্থাপন করেন। প্রেস এবং প্রেস ক্লাব গভীর সম্পর্ক যুক্ত শব্দ দু’টি এক সময় একাত্মতা ঘোষনা করেন। এই প্রেস ঘরে বসেই সর্বপ্রথম ঘাটাইলের উঠতি সাংবাদিকগণ বসার এবং কিছু বলার সুযোগ লাভ করে। এই সময় মতিয়ূর রহমান, জিন্না-বিন জয়েন উদ্দিন, এম এ লতিফ, সাংবাদিক হায়দার রহমান, নৃপেন বিশ্বাস, রঞ্জন কুমার সাথী, সংগঠক আশরাফুল ইসলাম মুকুল। এরা প্রথমত ঃ সাহিত্য, কবিতা ও সাংবাদিকতা নিয়ে বৈঠকী আলোচনার সূত্রপাত করে। এই সময় মূলত ঃ ঘাটাইলের সাংবাদিকদের মনে একটি প্রেস ক্লাব জন্ম দেবার তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে এবং উন্নয়নশীল ঘাটাইলে বহুমুখী প্রতিযোগিতা মূলক ঃ উন্নয়নের প্রতি লক্ষ্য করে এর একটা দারুন অভাব অনুভূত হয়।
১৯৮৪ সালে এদেশের বরণীয় মজলুম জননেতা মাও আঃ হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যু দিবসে তার স্মরণ সভায় (লিলি প্রেসের সামনে) অধ্যাপক সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আলোচনা শেষে প্রথম ঘাটাইলে প্রেস ক্লাবের কাঠামো গত প্রক্রিয়া সূচীত হয়।
এর আগে ঘাটাইলে এমন চিন্তার প্রকাশ ঘটেনি। যদিও ঐতিহাসিক এবং গুপ্তবৃন্দাবন, দক্ষিণে ফটিকজানী, উত্তরে মধুবনের বংশাই দ্বারা এ ভূÑখন্ড। বহু লেখক, কবি, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবির এ অঞ্চল। কথা সাহিত্যিক ইব্রাহীমা খাঁ, কবি মোফাখখারুল ইসলাম, সনেটর রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরী, ভাষা সৈনিক শামছুল আলম এবং তৎকালীন ‘দি ডেইলী মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার একজন সাংবাদিকও এখানে ছিলেন। অথচ জানা মতে বা ইতিহাসের গোড়ার কোন অংশে প্রেস ক্লাবের উদ্ভাবনের নজির পাওয়া যায় নি।
অতঃপর একদিন বদনাম আর রইল না। দীর্ঘ প্রতিক্ষিত প্রহর কেটে গেল। ১৯৮৫ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘাটাইলে প্রেস ক্লাবের পত্তন নামা প্রস্তুত যল। যারা এতদিন প্রয়োজন অনুভব করে আসতে ছিলেন তারা হলেন, জনাব হায়দার রহমান, শ্রী নৃপেন বিশ্বাস, শ্রী রঞ্জন কুমার সাথী, এম এ লতিফ, রফিকুল ইসলাম ও আতা খন্দকার।অধ্যাপক মুতিয়ূর রহমান খান, এডভোকেট মাহবুবুল বাচিত চাঁন মিয়া প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ নিয়ে এগিয়ে আসেন।
সভাপতি অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন( দৈনিক ইত্তেফাক)সাধারণ সম্পাদক হায়দার রহমান সমন্বয়ে ঘাটাইল প্রেস ক্লাবের প্রথম কমিটি গঠিত হয়।এই সময় একটি সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হায়দার রহমানকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাহা সর্ম্পূনতা লাভ করেনি।১৯৮৭ সালে সভাপতি হায়দার রহমান সম্পাদক নৃপেন বিশ্বাস।১৯৮৮ সালে সভাপতি এস আকবর খান সম্পাদক সেলিম জাহাঙ্গীর।এই ক্লাবের সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয় ১৯৯০ সালে। সভাপতি নৃপেন বিশ্বাস সম্পাদক আতা খন্দকার। এই সময় থেকেই ঘাটাইল প্রেস ক্লাব ভাটার টানে ধীরে বহে মেঘনা এই গতিতে এগিয়ে চললেও এক সময় থেমে যায় এর গতি। তবে যতক্ষণ এ ধারা প্রবাহমান ছিল ততক্ষণ এর গর্জন সিংহের মতই ছিল। এই সময় ‘দেশ কাল সাংবাদিকতা শীর্ষক’ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বহু খ্যাতনাম সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলোচক ছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংবাদিক সমিতির সভাপতি জনাব সফি উদ্দিন আহম্মেদ। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে অগ্রসর পৃথিবীর এক কোনে এসে যায় এর প্রজ্জ¦লিত আলোর মশাল।
প্রায় চার-পাঁচ বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের দিকে নতুন প্রজন্মের তৎকালের বেশ কয়েক জন উঠতি সাংবাদিক এস আকবর খান, শেখ জয়েন উদ্দিন, সাইয়্যিফ মোহাম্মাদ হামিদুল্লাহ, নজরুল ইসলাম, নূরুজ্জামান মিঞা, খন্দকার শাহীন কাদির ও ফজলুর রহমান এদের দ্বারা ধীরে ধীরে নব উদ্যোমে জ্বলে উঠতে শুরু করে। কিছুদিন পরে মাঝ পথে থেমে যায় এর গতি।
অবশেষে ২০০২ সালে এসে ঘাটাইলের একঝাক টগবগে তরুণ সাংবাদিক বুকে-মুখে অসীম সাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসে। সংকল্প একটাই-“ঘাটাইল প্রেস ক্লাব চাই”।যারা মরণপণ বদ্ধপরিকর হলেন তাদের মধ্যে সাংবাদিক সাইয়্যিফ মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ (দিনকাল), নজরুল ইসলাম (মানবজমিন), নূরুজ্জামান মিঞা (ইত্তেফাক), স্বাধীন আজম (প্রবাসী), আব্দুল্লাহ আল মাসুদ (নয়াদিগন্ত), সাজ্জাদুর রহমান (পূর্বাকাশ), শফিকুল ইসলাম ( দেশ জনতা), নাসির উদ্দিন (একুশের বানী), সফিকুর রহমান (বাংলার জমিন)। এরা বুক ভরা সাহস নিয়ে নব উদ্যোমে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে এক সাধারণ সভার মাধ্যমে ঘাটাইলের সুধীজনের সাহায্য প্রার্থী হন। তাদের আহবানে সারা দিয়ে যারা এগিয়ে আসেন তারা হলেন, অধ্যাপক এস. এম মজিবুর রহমান, অধ্যাপক এস. এম খলিলুর রহমান, অধ্যাপক মতিয়ূর রহমান খান।
এ পর্যায়ে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নিয়ে এগিয়ে আসেন মোঃ কামাল হোসেন, মোঃ জিল্লুর রহমান জুলহাস, প্রবীণ সাহিত্যিক জনাব মুজাফ্ফর আলী তালুকদার, আমিনুল ইসলাম। এদের সকলের সম্মিলিত পচেষ্টায় নিরন্তর স্বাক্ষী বর্তমান ঘাটাইল প্রেস ক্লাবের বাস্তবতা।
সাংবাদিক এবং সূধীজনের সমন্বয়ে সভায় ঘাটাইল প্রেস ক্লাবের অতীত পটভূমি পর্যালোচনা শেষে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ঘাটাইল প্রেস ক্লাবের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং একই সাথে সুধীজনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের নিমিত্তে একটি আহবায়ক কমিটি ও সংবিধান প্রনয়ন কমিটি গঠিত হয়। কোন ক্রমেই যাতে অতীত ব্যর্থতার জের পুনরাভিত্তি না ঘটে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সংবিধান প্রনয়নে মোঃ কামাল হোসেন, অধ্যাপক এস. এম মজিবুর রহমান, অধ্যাপক মতিয়ুর রহমান, অধ্যাপক খলিলুর রহমান, জিল্লুর রহমান জুলহাস, নজরুল ইসলাম, মোঃ নূরুজ্জামান মিঞা, বিশেষ আবেদন রাখেন।
সংগৃহীত- ঘাটাইল প্রেস ক্লাবের সংবিধান হতে।
