বুধবার, অক্টোবর ১০, ২০১৮

তারেক রহমান যেভাবে আসামি

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ৪৯ আসামির মধ্যে তারেক রহমানের বিষয়ে কী আদেশ হয়, নিশ্চিতভাবেই সেদিকে থাকবে নজর। অন্য আসামিদের মতো তারও মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

এই মামলায় তারেক রহমান আসামি হয়েছেন হামলার ছয় বছর পর ২০১০ সালে। আর বিএনপি অভিযোগ করছে, তাকে আসামি করাটা সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর বিএনপির শাসনামলে এই হামলার হোতা হিসেবে হকার জজ মিয়াকে সামনে আনার চেষ্টা হয়। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ধরা পড়ে যায় সেই অপচেষ্টা। তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টুসহ ২২ জনের নামে প্রতিবেদন দেয় পুলিশ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অধিকতর তদন্তে আসামি করা হয় নতুন ৩০ জনকে। আর সে সময়ই আসামি হন তারেক, বাবর, ডিউকরা।

মামলায় মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে তারেক রহমানকে। সম্পুরক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হাওয়া ভবনে করা বৈঠক থেকে থেকে জঙ্গিদের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে আসামিদের অপরাধ সম্পর্কে বলা হয়, ২০০৪ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আল মারকাজুল ইসলামীর একটি মাইক্রোবাসে করে হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিন আল যোগে বনানীর হাওয়া ভবনে যান। তাদের সঙ্গে আল মারকাজুলের (এনজিও) কর্মকর্তা আবদুর রশিদও ছিলেন।

আবদুর রশিদকে নিচতলায় দাঁড় করিয়ে ওই জঙ্গি নেতারা হাওয়া ভবনের দোতলায় যান। তারা সেখানে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকে জঙ্গিরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের ওপর হামলার বিষয়ে সহযোগিতা চান। বৈঠকে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের তারেক জিয়া সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এরপর মুফতি হান্নানসহ জঙ্গিরা বাড্ডায় ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে গোপন বৈঠক করে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।

হাওয়া ভবনে বৈঠকের পর ১৮ আগস্ট (২০০৪) তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডিতে সরকারি বাসায় মাওলানা আবু তাহের, তাজউদ্দিন ও মুফতি হান্নান বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, পরিবহন-মালিক মো. হানিফ ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

আবদুস সালাম পিন্টু ও বাবর বৈঠকে জঙ্গি নেতাদের বলেন, তাদের হানিফ ও আরিফুল ইসলাম সব রকম সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া তারা (পিন্টু ও বাবর) সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করবেন বলেও আশ্বাস দেন।

এই বৈঠকের পর ২০ আগস্ট জঙ্গি আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল, মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল ধানমন্ডিতে আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় যান। সেখান থেকে তাজউদ্দিনের দেওয়া ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড নিয়ে বাড্ডায় মুফতি হান্নানের কার্যালয়ে যান। ওই দিনই ২১ আগস্ট আক্রমণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

অভিযোগপত্রে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য সাবেক উপমন্ত্রী পিন্টুর ভাই তাজউদ্দিনকে অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পিন্টু ও তাজউদ্দিনকে এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে দেওয়া মূল অভিযোগপত্রেই আসামি করা হয়েছিল। সম্পূরক অভিযোগপত্রে তাদের আরেক ভাই রাতুল বাবুকেও আসামি করা হয়েছে।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়, মাওলানা তাজউদ্দিন পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়াকালে কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবা, তেহরিক-ই জিহাদ আল ইসলাম ও হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে জড়িত হন। তার সঙ্গে জোট সরকার আমলে লুৎফুজ্জামান বাবরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

বাবরের সঙ্গে পলাতক থাকা অবস্থায় মুফতি হান্নান ও আরেক জঙ্গি ফরিদপুরের কামাল উদ্দিন শাকেরেরও যোগাযোগ ছিল। তারা ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় বোমা পেতে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলা এবং ফরিদপুরের বোমা হামলার মামলা থেকে রক্ষা পেতে বাবরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই মামলার আসামি হুজির শীর্ষস্থানীয় নেতা মাওলানা সালাম, মুফতি হান্নান, মাওলানা শেখ ফরিদ, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুর রউফসহ অন্যান্য জঙ্গি নেতা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের হত্যার জন্য অনেক আগে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

সম্পূরক অভিযোগপত্রের বিবরণে বলা হয়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে বিভিন্ন কাজকর্মে বিএনপির সাংসদ শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সহযোগিতা করেছিলেন।

২০০৪ সালের প্রথম দিকে কায়কোবাদের সহযোগিতায় বনানীর হাওয়া ভবনে জঙ্গি নেতারা গিয়ে তারেক জিয়া ও হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম দেখা করেন। তখনই জঙ্গিরা শেখ হাসিনাসহ তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং জঙ্গিদের বিভিন্ন কাজকর্ম চালাতে সহযোগিতা চান। এরপর তারেক রহমান সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার সমাবেশে ওই গ্রেনেড হামলা হয়। এতে দলের ২৩ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ কয়েকশ ব্যক্তি।

এই হামলার পর সে সময়ের ‍পুলিশ হামলাকারীদের বাঁচিয়ে নিরীহ জজ মিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়।

জজ মিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা ছাড়াও হাইকোর্টের বিচারপতি জয়নাল আবেদীনের একটি বিচারিক তদন্ত নিয়ে সে সময় হাস্যরস হয়েছিল। জয়নাল তার প্রতিবেদনে ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এই হামলার ছক সেখানেই হয়েছে। আর একটি লোহার খাঁচাকে সামনে রেখে হামলাকারীরা অনুশীলনও করেছে।

আইনজীবীরা যা বলছেন

এই মামলায় তারেক রহমানের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্তি আইনজীবী এ কে এম আখতার হোসেন বলেন, ‘অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারেক রহমান। কিন্তু বাস্তবতা হলো ওই হামলার সময় তারেক রহমান বিএনপি কিংবা চারদলীয় জোট সরকারের এমন দায়িত্বশীল পর্যায়ের কেউ ছিলেন না যে তিনি এ ধরনের আশ্বাস দিতে পারেন। দিলেও তাতে আস্থা রেখে কেউ এ ধরনের হামলা চালাতে পারেন। তাই এটা পরিষ্কার যে এ মামলায় তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে।’

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে এই মামলার প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে এ মামলায় জড়ানো হয়নি। গ্রেনেড হামলার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তারেক রহমান যে জড়িত, রাষ্ট্রপক্ষ তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তারেক রহমান তার বনানীর হাওয়া ভবনে ষড়যন্ত্র বৈঠক করেছিলেন। অপরাধের সম্পৃক্ততার ভিত্তিতেই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা আসামি হয়েছেন।’ সূত্র : ঢাকাটাইমস