নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক জোট ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ যখন পরিসর বাড়াতে একের পর এক আলোচনায় বসছে তখন বিএনপির বিরুদ্ধে জোটের অন্য শরিক দলগুলোকে অন্ধকারে রাখার অভিযোগ এনে ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেল বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—ন্যাপ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এনডিপি। দল দুটি বলছে তারা জোটের সঙ্গে ‘সম্পর্ক ছিন্ন’ করেছে।
দীর্ঘদিনের অভিমান আর অভিযোগ নিয়ে মঙ্গলবার (১৬ অক্টোবর) বিকালে ছয় বছরের বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিন্ন করল বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি। তার সঙ্গে ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করলেন এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজাও।
ন্যাপ ও এনডিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা, তা এখনও অন্ধকারে। অন্যদিকে পর-পর দুই নির্বাচনে অংশ না নিলে আরপিও অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিল হবে। এ কারণে দলদুটো চায়, প্রচলিত আইন মেনেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে।
ন্যাপ ও এনডিপির নেতারা মনে করেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোটকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হবে। আর এর মধ্য দিয়ে বিএনপিই মূলত জোটকে বিলুপ্ত করে দিতে চাইছে। যদিও সোমবার (১৫ অক্টোবর) রাতে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
জোটের সেই বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানানো হয়, ঐক্যফ্রন্টকে স্বাগত জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০ দলীয় জোট। একইসঙ্গে ঐক্যফ্রন্টে চারটি দলকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
জেবেল রহমান গাণি বাংলাদেশ ন্যাপের চতুর্থ চেয়ারম্যান। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে দলটি গঠিত হয়। এরপর ৭৬ সালে দলের সভাপতি নির্বাচিত হন মশিউর রহমান যাদু মিয়া, যিনি গাণির দাদা (বাবার বাবা)। এরপর তার নেতৃত্বেই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগ দেয় ন্যাপ। এরপর ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ এ ন্যাপ যুক্ত হয়।
জেবেল রহমান গাণি জানান, বিএনপি গঠনের পূর্বে ন্যাপকে স্থগিত করেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া। বিএনপি গঠনের প্রক্রিয়ার সময় ন্যাপের বিভাজন হয়। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যেতে রাজি না হয়ে আলাদা হন নাসের খান ভাসানী, সেটা ছিল একটি ক্ষুদ্র অংশ। মূল ন্যাপ নিয়ে যাদু মিয়া ধানের শীষ প্রতীকের সঙ্গে বিএনপি গঠন করেন।
গাণি বলেন, ‘২০০৬ সালের ডিসেম্বরে আমার পিতা শফিকুল গণি স্বপন ন্যাপকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ২০০৮ সালে ন্যাপ তার নেতৃত্বেই নিবন্ধন লাভ করে। তার মৃত্যুর পর ২০০৯ সালের আগস্ট ২৩ আগস্ট আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং ২০১০ সালের প্রথমার্ধে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব শুরু করি।’
মঙ্গলবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় গুলশানের ইম্যানুয়েলস ব্যাংকুয়েট হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি।
জোট ভেঙে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল গাণি বলেছেন, ন্যাপ ও এনডিপি সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে। শুধু ক্ষমতার পালা বদলের নামে কোনো অশুভ শক্তির ক্ষমতা গ্রহণ করে ফের দেশকে রাজনীতিশূন্য করার কোনো অপচেষ্টায় অংশগ্রহণ করুক, একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা তা প্রত্যাশা করি না।
তিনি বলেন, বিএনপি সব সময় তার শরিকদের অন্ধকারে রাখার অপচেষ্টা করে গেছে। জাতীয় নির্বাচন কাছাকাছি হলেও সে বিষয়ে বিএনপি তার অবস্থা শরিকদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করছে না।
এর আগে জেবেল রহমান গাণির বলেন, জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, গত ১৩ অক্টোবর বিএনপি, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ।
ন্যাপ ও এনডিপির নেতাদের ভাষ্য, বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচন নিয়ে ২০ দলীয় জোট থেকে কোনো উদ্যোগ বা সংলাপ করেনি। যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আসনের বিষয়ে বিএনপির আলোচনা প্রকাশ্যে এসেছে।
এক্ষেত্রে বিএনপির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে ন্যাপের। এছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকে কখনো ন্যাপের চেয়ারম্যানকে সংসদীয় আসন দেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত বা সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ন্যাপ চেয়ারম্যানের নির্বাচনী এলাকা নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে বিএনপির সমর্থন চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হন গাণি।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিভিন্ন বৈঠকে জোট শরিকদের মনোনয়নের বিষয়টি সামনে আনতে চাইলেও বিএনপি কৌশলে তা এড়িয়ে যায়। আর ১/১১ কুশীলব, মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নকারীরা যখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, তখন আমরা মনে করি, বিএনপি তার সব নৈতিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে আসার পেছনে অনেকগুলো কারণ পাওয়া গেছে দলটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে। তাদের ভাষ্য, বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচন নিয়ে ২০ দলীয় জোট থেকে কোনও উদ্যোগ বা সংলাপ করেনি। যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন, আসম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আসনের বিষয়ে বিএনপির আলোচনা প্রকাশ্যে এসেছে। এক্ষেত্রে বিএনপির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে ন্যাপের। এছাড়া, বিএনপির পক্ষ থেকে কখনও ন্যাপের চেয়ারম্যানকে সংসদীয় আসন দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত বা সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ন্যাপ চেয়ারম্যানের নির্বাচনি এলাকা নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে বিএনপির সমর্থন চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হন গাণি।
জোট ছেড়ে নতুন কোনও জোটে যাওয়ার চিন্তাভাবনা আছে ন্যাপ ও এনডিপির। এক্ষেত্রে বি. চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট বা অন্য কোনও জোটে দেখা যেতে পারে দল দুটিকে। এ বিষয়ে জেবেল রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে যেকোনও রাজনৈতিক মেরুতে ঐক্যবদ্ধ আপত্তি থাকবে না।’
‘ন্যাপ ও এনডিপি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, আমরা সংবিধানের ঊর্ধ্বে না। আইনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি থাকতে চাই, তাহলে আইনের অধীনেই থাকতে হবে। এই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছি, প্রত্যেকটি দল ভোটের মেজাজে চলে গেছে’— নিজের অবস্থানও তুলে ধরেন জেবেল রহমান গাণি।
এর আগে বিএনপি গত শনিবার ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, জাসদ (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি জোট করেছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের জোটগত সম্পর্ক ত্যাগ করে ইসলামি ঐক্যজোট। এর আগের বছর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিএনপি জোটে ভাঙন ধরিয়ে বেরিয়ে যায় শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। প্রয়াত নীলু ওই সময় অভিযোগ করেছিলেন, ২০ দলের জোটে বিএনপি-জামায়াত সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতো।
মঙ্গলবার (১৬ অক্টোবর) ন্যাপ ও এনডিপি বেরিয়ে গেলে গত দুই বছরে তৃতীয়বারের মতো ভাঙনের কবলে পড়ল বিএনপি জোট।
১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম এবং ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চার দলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
এরপর ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল কলেবরে বেড়ে ১৮ দলীয় জোট হয়। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল যোগ দিলে তা ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
অামাদের ঘাটাইল সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷