মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮

অপরাধের পুরস্কার নয়, যোগ্যতার মূল্যায়ন!

।। সরোয়ার সৈকত ।। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল ৩ (ঘাটাইল) আসনটি অত্যন্ত আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ। এ আসনের বর্তমান সাংসদ আমানুর রহমান খান রানাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে আমানুরের বাবা আতাউর রহমান খানকে। তিনি সোনালী ব্যাংকের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক। চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। আতাউর রহমান খানকে মনোনয়ন দেয়া নিয়েই এ আসনটি সারাদেশে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

২৭ নভেম্বর ২০১৮, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো-র অন লাইন ভার্সনে বিশিষ্ট কলাম লেখক সোহরাব হাসানের 'অপরাধের পুরস্কার' শিরোনামে একটি লেখা আমার দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি লিখেছেন- ''উদ্বেগের বিষয় হলো, লোকলজ্জার ভয়ে যে দুজন অতি বিতর্কিত ও নিন্দিত সাংসদকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিতে পারেনি, সান্ত্বনা হিসেবে সেই মনোনয়ন তাঁদের পরিবারেই রেখে দিয়েছে। বাইরে যেতে দেয়নি। এই দুই সাংসদ হলেন কক্সবাজার-৪ আসনের (টেকনাফ-উখিয়া) আবদুর রহমান ওরফে বদি ও টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের আমানুর রহমান খান ওরফে রানা। তিনি আরো লিখেছেন- ধর্মের কথা হলো, পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু এখানে পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে পুরস্কৃত করা হলো।'’ 
পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে পুরস্কৃত করা হলো- সোহরাব হাসানের এই কথাটির সাথে আমি শুধু ভিন্ন মত পোষণ করছি না, তীব্র প্রতিবাদও জানাচ্ছি। কারণ আতাউর রহমান খান শুধু আমানুরের বাবা নন তিনি সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহযোদ্ধা প্রয়াত শামসুর রহমান খান শাহজাহানের আপন ছোট ভাই। যিনি আজীবন নির্লোভ ও নির্মোহ রাজনীতি করে গেছেন। ৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন। গণমানুষের নেতা হিসেবে শামসুর রহমান খান শাহজাহানের মতো নিবেদিত প্রাণ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ দেশ ও জনগণের কল্যাণে যে অবদান রেখে গেছেন তার জন্য জাতি তাকে চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। সেই পরিবারের সদস্য হিসাবে আতাউর রহমান খানের মতো একজন সজ্জন রাজনৈতিককে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এই পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস অশ্রু আর রক্তভেজার ইতিহাস, দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। রাজনীতির কারণে নিজ পুত্রকে বিসর্জন দিতে হয়েছে আতাউর রহমান খানকে। ২০০৩ সালের ২ নভেম্বর তারাবির নামাজ পড়তে যাবার সময় বাড়ির কাছেই তাঁর বড় ছেলে তরুণ উদীয়মান আওয়ামীলীগ নেতা আমিনুর রহমান খান বাপ্পিকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়।

আরো একটু পেছনে ফিরে আসা যাক। আওয়ামী লীগে খান পরিবারের আবির্ভাব ঘটে শামসুর রহমান খান শাহজাহানের মাধ্যমে। তিনি ১৯৫৪ থেকে ৫৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তারপর ১৯৬৫ থেকে ৬৬ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের গণপরিষদ নিবার্চনে এমএনএ এবং ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে শামসুর রহমান খান শাহজাহান টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে শামসুর রহমান খান শাহজাহান কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মননীত হন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক থেকে পুনরায় টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয় তাকে। শামসুর রহমান খান শাহজাহান ২০১১ সালের ২ জানুয়াারি মৃত্যুবরণের আগ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। 
আতাউর রহমান খান হচ্ছেন এমন একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তিনি উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তাকে নিয়েই জনাব সোহরাব হাসান বলেছেন- জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন সাংসদপুত্রের কল্যাণে। আবার তিনিই বলেছেন- আমানুরের বাবা আতাউর রহমান সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। অবসর নেওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও কখনো নেতৃত্বে আসেননি। যদি সাংসদপুত্রের কল্যাণে সদস্য হতে পারেন, ইচ্ছা করলে তিনি নেতৃত্বেও আসতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এবারের নির্বাচনেও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেননি। আওয়ামী লীগের মাননীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজে আগ্রহী হয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী ৮/১০ জন প্রার্থীর মধ্যে থেকে তাকেই বেছে নিয়েছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার মানে এই নয় তিনি অপরাধী। তবু সেসব বিবেচনায় রেখে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। সরকার দলীয় সাংসদ হয়েও অপরাধী প্রমাণ না হওয়ার পরও তাঁর জেলে থাকা এবং নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়াটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজীরবিহীন! এটি অপরাধের পুরস্কার নয়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দুরদর্শী সিদ্ধান্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অামাদের ঘাটাইল সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷