বুধবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৬

মিরপুরের জল্লাদখানায় স্মৃতিপীঠ

মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বেনারসী পল্লিতে গিয়ে রিকশাচালককে বলা মাত্রই নিয়ে গেল জল্লাদখানায়। লোকমুখে এই নামে পরিচিত স্থানটি আসলে জল্লাদখানা বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বেদনার অনেক ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বধ্যভূমি। স্থানীয় অবাঙালি আর দেশীয় স্বাধীনতাবিরোধীরা অনেকটা জল্লাদের কায়দায় বাঙালি নিধন করেছে এখানে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে এটি রূপ নিয়েছে জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে। এর সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে বাম পাশে তাকালে অনেকগু ফলক চোখে পড়বে। সেখানে পাশাপাশি লেখা আছে  সারা দেশের বধ্যভূমির নাম-ঠিকানা। মাঝেমধ্যে কাচের ঘরে বিশেষ কয়েকটি বধ্যভূমির মাটি রাখা আছে। মাটিগুলোর দিকে তাকালে যেন মনে হবে এই মাটিতে আছে শত শত মানুষের কান্না, আর্তনাদ আর তাদের রক্ত-মাংস।
কথা হয় জল্লাদখানা বধ্যভূমির প্রহরী আবদুর রহিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রতিদিন এটি খোলা থাকে। বিনামূল্যে সবাই এখানে প্রবেশ করতে পারে।’ কাচে ঢাকা একটি কূপ দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এখানে বহু বাঙালিকে ধরে এনে জবাই করে ফেলে দেওয়া হয়।’ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে প্রায় দেড় যুগ আগে জল্লাদখানা বধ্যভূমি থেকে ৭০টি মাথার খুলি ও ৫৩৯২টি হাড়গোড় উদ্ধার করা হয় বলে তিনি জানান।
জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে একদিকে আছে গণহত্যার দেশি-বিদেশি নানা তথ্য, আবার স্থাপত্যশৈলীতেও এটি অনন্য। চারকোণাকৃতির ইটের তৈরি দেয়ালে একটি সূর্যের মুখ ও মানুষের দেহ অবয়বে ইটের প্রতিকৃতি। তার পাশের দেয়ালে তুলে ধরা হয়েছে সারা বিশ্বের বিশ শতকের গণহত্যার তথ্যবহুল একটি ফলক। এ থেকে জানা যায়, বিভিন্ন দেশে গণহত্যায় নিহত মানুষের সংখ্যা। এর মধ্যে আর্মেনিয়ায় ১৫ লাখ, জার্মানিতে এক কোটি ১০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ১২ লাখ, ভিয়েতনামে ৩০ লাখ, বাংলাদেশে ৩০ লাখ, কম্বোডিয়ায় ১৭ লাখ, সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় ২ লাখ ২৫ হাজার, রুয়ান্ডায় ১০ লাখ, আফগানিস্তানে ২০ লাখ, পূর্ব তিমুরে ২ লাখ, সুদানে ২০ লাখ মানুষ হত্যার শিকার হয়। সবার শেষে ইংরেজি ও বাংলায় পর্যায়ক্রমে লেখা- ‘ঝঃড়ঢ় এবহড়পরফব/ গণহত্যা বন্ধ কর।’
পুরো স্মৃতিপীঠের পরিকল্পনাকারী স্থপতি রবিউল হুসাইন। এখানে আছে রফিকুন নবীর দেয়ালচিত্র। এই দেয়ালচিত্রে প্রতীকীভাবে উঠে এসেছে শহীদদের কঙ্কাল-করোটি।  এর পাশেই ছোট্ট একটি ঘর। এখানেই আর একটি কূপ। কাচের গ্লাসে ঢাকা। জবাই করে এখানে ফেলে দেওয়া হতো লাশ। পাশে কাচের দেয়ালে ঢাকা একটি শেলফ। রাখা আছে সে সময়ে পাওয়া স্যান্ডেল, জামা-কাপড়, তসবিহসহ ব্যক্তিগত ব্যবহারের নানা জিনিসপত্র। এক পাশের দেয়ালে কাচের ওপরে লেখা এ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া শহীদদের নাম-ঠিকানা। সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য অভিশপ্ত কূপটি ভারী কাচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
কূপঘর থেকে বের হয়ে চোখে পড়ে একটি উঁচু  ইটের নির্মিত স্তম্ভ। এর পাশের ঘরটিতে রয়েছে মন্তব্য করার বইসহ তথ্যবহুল অ্যালবাম। কথা হয় জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে শহীদ আবদুল হাকিমের বড় ছেলের সঙ্গে। তিনি জানান, তার বাবা ও চাচাকে এখানে বিহারিরা ধরে এনে হত্যা করে। তখন তার বয়স ছিল ৭ মাস। তিনি তার মায়ের কাছ থেকে এসব কথা শুনেছেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা এখানে ভয়ে কেউ আসতাম না। ২০০০ সালের আগে এখানে দুপুরের পর কেউ আর আসত না ভয়ে। আশপাশে যারা থাকত তারা দুপুরের আগেই দোকানপাট বন্ধ করে চলে যেত। ১৯৯৯ সালে খনন কাজ শুরু হলে তারপর থেকে এখানে মানুষ আসতে থাকে।
কথা হয় জল্লাদখানা বধ্যভূমির ইনচার্জ কে এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, এখানে একজন পিয়ন ও ২ জন নিরাপত্তীরক্ষী কাজ করছেন। প্রতি বছর ৮ দিন এখানে অনুষ্ঠান করা হয় ট্রাস্টের অর্থায়নে। শহীদের সন্তানদের নাচ, গান, আবৃত্তি ও অভিনয় শেখানো হয় ট্রাস্ট থেকে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ১৪ ডিসেম্বর বিকেল চারটা থেকে ৩ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। প্রতিদিন ২ জন করে শহীদ পরিবারের সন্তান স্মৃতিচারণ করবেন।
সূত্র ঃ ঢাকা টাইমস্ , ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬ ইং

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অামাদের ঘাটাইল সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷