১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে টাঙ্গাইল এলাকায়
হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ০২ টি অস্ত্রবোঝাই জাহাজ দখল ও ধ্বংসের
ইতিহাস এখনো সেই এলাকার গণমানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। যুদ্ধের সময়কার
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ১১টি সেক্টরের বাইরে স্বতন্ত্রভাবে গঠিত কাদেরিয়া
বাহিনীর বীরত্বপুর্ণ ও দুঃসাহসী যুদ্ধের কথা বাঙালি জাতি চিরকাল স্মরণ
করবে।
জাহাজ আক্রমণে সফল নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে হাবিবুর রহমান ‘জাহাজ মারা
হাবিব’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলায়।
কাদের সিদ্দিকী’র নিয়ন্ত্রণাধীন ৯৭ কোম্পানী বিশিষ্ট প্রায় ১৫ হাজার
যোদ্ধার এক অভিনব বাহিনীতে এই হাবিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম একজন কোম্পানী
কমান্ডার। স্বাধীনতার পর তাকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভুষিত করা হয়। সেই
দিগ্বিজয়ের ইতিহাস সৃষ্টিরও বহু বছর পর অনেকের মতো ঘটনার নায়ক মুক্তিযোদ্ধা
হাবিবুর রহমান বীরবিক্রম ওরফে ‘জাহাজ মারা হাবিব’ অনেকটা হতদরিদ্র ও
নিঃস্ব অবস্থায় অবহেলায় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৯৮ মৃত্যুবরণ করেন।
যুদ্ধের সময়কার কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান এনায়েত করিম তখনকার সেই ঘটনা
নিয়ে কিছু স্মৃতি বিধৃত করেন। তিনি জানান : তখন আগস্ট মাস। বর্ষাকাল।
মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করতে মরিয়া। যেখানে হানাদার বাহিনী
সেখানেই আমরা। আমি ছিলাম টাঙ্গাইলের পশ্চিম এলাকার দায়িত্বে। যমুনা নদীর
পাড় এলাকার দায়িত্বে ছিল খোরশেদ। আগস্ট মাসের প্রথম দিকের কথা। পাকিস্তানি
বাহিনীর অস্ত্রবাহী ০৭টি জাহাজ যাচ্ছিল যমুনা নদী দিয়ে দেশের উত্তর সীমান্ত
এলাকায়। উদ্দেশ্য, ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় তাদের শক্তি বৃদ্ধি করা।
জাহাজগুলো আসছিল ঢাকা সদরঘাট ইপিআর জেটি থেকে। কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান
কাদের সিদ্দিকী জানতে পারেন যমুনা নদী দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রবাহী
জাহাজ আসছে। ওই ০২ জাহাজের নাম ছিল যথাক্রমে ‘এস. ইউ. ইঞ্জিনিয়ারস্ এলসি ৩’
এবং ‘এস টি রজার’।
হাবিবুর রহমানকে জাহাজ আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আগস্টের ১২ তারিখ সকালে (১১ তারিখও বলা হয়ে থাকে) সুযোগ বুঝে জাহাজে আক্রমণ করা হয়।
হাবিবুর রহমান রেজাউল করিমকে (ভারত থেকে এসে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেন) সঙ্গে নিয়ে জাহাজের এলাকা রেকি (পরিদর্শন) করেন।
০২টি জাহাজই যমুনা নদীর চরে আটকে গিয়েছিল বা আটকে দেয়া হয়েছিল। সেখানে
নেপথ্যের কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে জাহাজের সারেং ও সুখানীদের কথাও আসে।
তারা দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে জাহাজগুলোকে নদীর চড়ায় আটকিয়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে কোন জায়গা থেকে আক্রমণ করলে জাহাজ ধ্বংস করা যাবে, সে স্থান চিহ্নিত করা হয়।
হাবিবুর রহমান তার কোম্পানী নিয়ে মাটিকাটা গ্রামে নদীর বাঁকে যুৎসই
পজিশন নেন এবং সবাই সুযোগ বুঝে তিন ইঞ্চি মর্টার, এলএমজি ও রাইফেল চালিয়ে
জাহাজের ইঞ্জিনভাগ ধ্বংস করেন।
হাবিবুর রহমানকে বলা হলো সবগুলি অস্ত্র থেকে এক যোগে ফায়ার করার জন্য
যাতে ওরা (পাকিস্তানিরা) মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের পরিমাণ বা ধরণ সম্পর্কে
কোনোকিছু অনুমান করতে না পারে। অবিরাম গোলাগুলি।
অনেক মুক্তিযোদ্ধা এ অপারেশনে অংশ নেন।
গুলিতে জাহাজে থাকা প্রায় অর্ধেক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। বাকিরা স্পিডবোটে করে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়।
পরে সন্ধ্যার দিকে জাহাজে গিয়ে দেখা যায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও
গোলাবারুদ। টাঙ্গাইল ভূঞাপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক নৌকা ও
স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করে অস্ত্র, গোলাবারুদ সরানো হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জেলা ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় : এসব
অস্ত্রশস্ত্রেরর বেশির ভাগই পাশের গ্রাম ভূঞাপুর ফলদার বিভিন্ন গোয়ালঘর ও
খড়ের স্তূপ ও মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে জাহাজের লগবুক ও মুভমেন্ট
কভারের হিসেব থেকে জানা যায়, জাহাজে ০১ লক্ষ ২০ হাজার বাক্সে ২১ কোটি টাকার
অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল।
০২ জাহাজ ভর্তি সেসব অস্ত্র সম্পুর্ণভাবে সরানো সম্ভব না হওয়ায়
বাকিগুলোসহ আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় জাহাজে। অস্ত্র, গোলাবারুদ ধ্বংস হওয়ার
বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে আশপাশের গ্রামাঞ্চল। সে এক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠান!
কয়েকদিন ধরে জ্বলে জাহাজের আগুন। হাজার হাজার উৎফুল্ল লোকজন সে আগুনের
শিখা বহুদূর থেকে প্রত্যক্ষ করে ও আনন্দে ফেটে পড়ে।
এদিকে জাহাজ ধ্বংসের খবরে পাকসেনারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ১৭ নভেম্বর
টাঙ্গাইল ভূঞাপুর সদর থেকে প্রায় ০১ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে ছাবিবশা
গ্রামে গণহত্যা চালায়। ওই দিন গ্রামের ৩২ জন নারী পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে
এবং গ্রামের প্রায় ৩৫০টি বাড়ীঘর আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
পাকিস্তানী হানাদাররা চারদিক থেকে টাঙ্গাইল ভূঞাপুর আক্রমণ করে। তীব্র
প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধারা। গেরিলা কায়দায় তাদের গতিরোধ করার
চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানিদের ভারী অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে
মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলে পিছু হটে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। পাকিস্তানিদের চতুর্মুখী
আক্রমণে পড়ে ঐতিহাসিক ঘাটাইলের মাকড়াই যুদ্ধে কাদের সিদ্দিকী নিজেও আহত হন
এবং চিকিৎসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে চলে যান।
কাদেরিয়া বাহিনীর চীফ কমান্ডারের দায়িত্বগ্রহণ করেন বাহিনীর বেসামরিক প্রশাসন প্রধান আনোয়ারুল আলম (শহীদ)।
মুক্তিযোদ্ধারা আরো শক্তিশালী হয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শেষপর্যন্ত জয় মুক্তিযোদ্ধাদের হয়।
ভূঞাপুরের সিরাজকান্দি মাটিকাটার জাহাজ ধ্বংস ও অস্ত্র উদ্ধারে
দেশব্যাপী গোটা মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি
সেনারা। কাদের সিদ্দিকী যুদ্ধের শেষদিকে ভারতে গিয়ে মিত্রবাহিনীর
সেনানায়কদের কাছে সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং তার উপর ভিত্তি করেই
অগ্রবর্তী দল হিসেবে টাঙ্গাইলে হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান থেকে হাজার হাজার
প্যারাট্রুপার (ছত্রীসেনা) নামানো হয়।
মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান বীরবিক্রম এর ছেলে সাংবাদিক আতিকুর রহমানের
সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান : মুক্তিযুদ্ধের সময় টাঙ্গাইল যমুনা
ধলেশ্বরী নদী পথের মাটি কাটা নামক স্থানে নদীর পথে করা নজরদারীর দায়িত্বে
ছিলেন হাবিবুর রহমান। তার অত্যন্ত দুরদর্শিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে
জীবনবাজি রেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের ০২টি অস্ত্র বোঝাই জাহাজ ধ্বংস
করার মাধ্যমে হানাদারদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়া হয়। বাংলাদেশ এতিহাসে
দীর্ঘ ৯ মাসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীদের সামগ্রীকভাবে
অন্য কোথাও মুক্তিবাহীদের হাতে এতবড় ক্ষতি ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়নি।
পরবর্তীতে যুদ্ধ জাহাজ ও অস্ত্র-শস্ত্র উদ্ধার করার জন্য পাকিস্তানি
কমান্ডের লে. জেনারেল আমীন আব্দুল্লা খান নিয়াজী ও বিগ্রেডিয়ার কাদের খানের
নেতৃত্বে ৪৭ ব্রিগেড, ৫১ কমান্ডো ব্রিগেড ও হানাদার বিমানবাহিনী
মুক্তিবাহিনীদের উপর চতুর্দিকে আক্রমণ করে। হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বের কাছে
পাকিস্তানিবাহীনি পিছু হটতে বাধ্য হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধর প্রেক্ষাপট পরবর্তনকারী অধ্যায়ন হিসেবে গণ্য এই
‘ভূঞাপুর মাটিকাটা যুদ্ধ’য় অসীম বলিষ্ঠ সাহসীকতায় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য
বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীরবিক্রম’ এবং ‘জাহাজ মারা হাবিব’ উপাধীতে ভূষিত
করে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল ভূঞাপুর উপজেলা কমান্ডার আব্দুল মজিদ মিয়া বলেন : আমরা
কয়েকজন হাবিবের নেতৃত্বে জাহাজ ০২টি আক্রমণ করি এবং আক্রমনে আমরা সফলভাবে
জয়ী হই। এই জাহাজ দুটি ধ্বংস না করা হলে ৯ মাসেই স্বাধীনতা পেতাম কিনা
সন্দেহ। মাটিকাটার যুদ্ধে স্মৃতিস্তম্ভটি সংরক্ষণের এবং সরকারিভাবে এই
দিবসটি পালন করা উচিৎ।
মুক্তিযোদ্ধা গবেষক ও লেখক শফি তরফদার আরও জানান : কাদেরিয়া বাহিনী
কোম্পানি কমান্ডার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ আগস্ট জাহাজ ০২টি ধ্বংস করে
প্রায় ২১ কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে। যা মুক্তিযুদ্ধের একটি
অবিস্মরণীয় ঘটনা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
অামাদের ঘাটাইল সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷