শুক্রবার, জানুয়ারি ০১, ২০১৬

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) এর মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি

ঘাটাইল উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসন গঠিত। এ আসনে বর্তমান ভোটার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদ এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি ও জোট সরকারের আমলে মন্ত্রিত্বও লাভ করেন। সেই থেকে ঘাটাইল আসনটি বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত। 
 কিন্তু ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘদিন দখলে থাকা আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। ২১ বছর পর এ আসটি আওয়ামী লীগের দখলে যায়। বিশিষ্ট চিকিৎসক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মতিউর রহমান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই এমপি নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে তিনি ভোট পান এক লাখ ৪০ হাজার ৬৮২ ভোট। তার নিকটতম বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ পেয়েছিলেন ৮৩ হাজার ৭৬ ভোট। ডা. মতিউর রহমান ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়ায় টাঙ্গাইল-৩ ঘাটাইল আসনটি শূন্য হয়ে পড়ে। গত ১৮ নভেম্বর শূন্য আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা শহিদুল ইসলাম লেবু। কিন্তু তার  মনোনয়নকে প্রত্যাখান করে নাগরিক কমিটির ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা। বিএনপি বিহীন নির্বাচনে আমানুর রহমান খান রানা শহিদুল ইসলাম লেবুকে দ্বিগুণেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেন। উপনির্বাচনের সময় ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। স¤প্রতি উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলেও অঙ্গসংগঠনের কমিটি এখনও গঠিত হয়নি।এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এ অবস্থায় দশম সংসদ নির্বাচনে কে পাবেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তা নিয়ে ধুর্মজালের সৃষ্টি হয়েছে।
নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকলেও এ আসনে বিএনপি অনেকটাই ঐক্যবদ্ধ। দ্বন্দ্ব-কোন্দল ভুলে নেতাকর্মীরা এখন অনেকটাই চাঙ্গা। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কারণে দ্বন্দ্ব থাকলেও সেটা ব্যক্তি পর্যায়ে রয়েছে এবং তাতে দলীয় কর্মকাণ্ডে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে না বলে দাবি করেন কার্যকরি কমিটির নেতারা। তারা মনে করেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদের নেতৃত্বে ঐক্যবন্ধ বিএনপি। অনেক শক্তিশালী বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি। তারা অনেকটাই মরিয়া আসনটি উদ্ধারে।
আওয়ামী লীগ : ১৯৭০ সালের গণপরিষদ নির্বাচনে এমএনএ এবং ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত নেতা শামসুর রহমান খান শাহজাহান। তার হাতেই ঘাটাইল আওয়ামী লীগের ভীত রচিত হয়। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু ১৯৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদের কাছে পরাজিত হন। তার পর থেকেই তিনি দলের মধ্যে কেন্দীয় ভাবে কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়েন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে কেন্দীয় নেতারা শামসুর রহমান খান শাহজাহান দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে  ঘাটাইল রাজনীতিতে নতুনমুখ ডা. মতিউর রহমানকে মনোনয়ন দেয়। তখন থেকেই দলের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। কিন্তু মাঠ পর্যয়ের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করায় ও ভোটের জোয়ারে বিএনপির ভিআইপি প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ডা. মতিউর রহমান।
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ডা. মতিউর রহমান স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে দলের একটি অংশকে গুরুত্ব দেয়ায় দলের মধ্যে  সৃষ্টি হয় উপদলীয় কোন্দলের। উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল চরম রূপ নেয়। ডা. মতিউর রহমান তার আশীর্বাদপুষ্ট তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবুকে সমর্থন দেন। এতে ক্ষিপ্ত হন দলের সিনিয়র নেতারা। তার প্রভাব পড়ে নির্বাচনে। এর ফলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সমর্থিত প্রার্থী নজরুল ইসলাম খান সামু বিজয়ী হন।
এর পর থেকে দলের মধ্যে বিভেদ আরো বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে দলের বঞ্চিতদের তালিকা। বঞ্চনা ধীরে ধীরে ক্ষোভে পরিণত হয়। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন তারা। দলের ভেতর গড়ে উঠে আরেক দল। আনাড়ি নেতারাদের দাপটে এ সময় স্থবির হয়ে পড়ে ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। এরই মধ্যে প্রবীণ নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান খান মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পর তার অনুসারিদের নিয়ে ঘাটাইলের রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে তার ভাতিজা জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানার। এ অবস্থায় ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যান ডা. মতিউর রহমান। এর ফলে শূন্য হয় টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনটি। ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর শূন্য আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান প্রয়াত এমপি ডা, মতিউর রহমানের অনুসারি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু। মনোনয়ন বঞ্চিত হন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা। কিন্তু তিনি লেবুর মনোনয়নকে চ্যালেজ্ঞ করে নাগরিক কমিটির ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেন। নির্বাচনে শহিদুল ইসলাম লেবুকে দ্বিগুনেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন রানা। উপনির্বাচনের সময় দলের নেতা কর্মীরা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে ফলে দলে বিভেদ রেখা আরো বেড়ে যায়। যা এখনও চলমান। উপনির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটির নেতা ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করায় সাংগাঠনিক কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। স¤প্রতি উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠিত হলেও অংঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠিত হয়নি। এ অবস্থায় অনেকটা স্থবির হয়ে আছে দলের কার্যক্রম। আগামী দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমানে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটাই আলোচনা আগামী নির্বাচনে কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন। মনোনয়ন দৌড়ে আছেন বর্তমান এমপি আমানুর রহমান খান রানা, গত উপনির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া শহিদুল ইসলাম লেবু।
উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক আজমল হোসেন বলেন, গত উপনির্বাচনের পর ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়। ইতিমধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। অঙ্গ সংগঠনের  কমিটি গঠিত হলেই সাংগাঠনিক দুর্বলতা কেটে যাবে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জামুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম খান হেস্টিং বলেন, বর্তমান এমপি আমানুর রহমান খান রানার নেতৃত্বে ঘাটাইল আওয়ামী লীগ এখন ঐক্যবন্ধ। দলে সাংগাঠনিক কোন দুর্বলতা নেই। ইতিমধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠিত হবে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সমর্থনে আগামী সংসদ নির্বাচনে বর্তমান এমপি আমানুর রহমান খান রানাই মনোনয়ন পাবেন বলে আমি আশাবাদী। রোদবৃষ্টি আধার রাতে বর্তমান এমপি রানা আছে  জনতার সঙ্গে।
মনোনয়নের ব্যাপারে গত উপনির্বাচনে দলের মনোনিত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম লেবু বলেন, আগামী দশম সংসদ নির্বাচনেও আমি মনোনয়ন প্রত্যাশী। আমি আশাবাদী দল আবার আমাকেই মনোনয়ন দেবে। দলের সাংগাঠনিক অবস্থা বর্ননা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি সফলতার সঙ্গে চারটি ইউনিয়ন কমিটি গঠন করার পর জেলা কমিটি হঠাৎ করে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য চিঠি দেন। ইতিমধ্যে জেলা কমিটি আবার আরেকটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে। বর্তমানে কমিটি ভাঙ্গা গড়ার খেলা চলছে ফলে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
বিএনপি : ১৯৭৯ সালে বিএনপির টিকেটে এ আসন থেকে ডা. শওকত আলী ভূঁইয়া এমপি নির্বাচিত হওয়ার মধ্যদিয়ে ঘাটাইলে বিএনপির গোড়াপত্তন শুরু হয়। পরবর্তীতে এরশাদ সরকার পতনের আন্দোলন মাধ্যমে ঘাটাইলে বিএনপি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। তারপর ১৯৯১ সাল, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদ এমপি নির্বাচিত হন। তিনি একাধিকবার মন্ত্রিত্বও লাভ করেন। মন্ত্রী থাকাকালীন সময় তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে উপজেলায় উন্নয়নমূলক কাজ করেন। তিনিই এখন পর্যন্ত এ আসন থেকে একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশী।
নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকলেও  ঘাটাইল উপজেলা বিএনপি অনেকটাই ঐক্যবন্দ। দ্বন্দ্ব-কোন্দল ভুলে নেতাকর্মীরা এখন অনেকটাই চাঙ্গা। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কারণে হাতেগোনা কয়েকজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও সেটা ব্যক্তি পর্যায়ে রয়েছে এবং তাতে দলীয় কর্মকাণ্ডে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে না বলে দাবি করেন কার্যকরি কমিটির নেতারা। তারা আরো জানান স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদের নিয়মিত যোগাযোগ সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উজ্জীবিত করছে। শক্তিশালী হয়ে উঠছে সাংগঠনিক ভিত্তি। আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-কোন্দল সাংগাঠনিক দুর্বলতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিএনপিতে।
২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে ঘাটাইল উপজেলা বিএনপি ও পৌর বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা কমিটির সভাপতি হন সিরাজুর হক ছানা সম্পাদক হন একেএম রেজাউল করিম পৌর বিএনপির সভাপতি হন বর্তমান পৌর সভার মেয়র মঞ্জুরুল হক সম্পাদক নির্বাচিত হন ফারুক হোসেন ধলা।  কমিটি গঠনের পর কিছু নেতাকর্মী উল্টোপথে চললেও বাকিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলকে শক্তিশালী অবস্থানে নিতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু দলীয় প্রায় সব কর্মসূচীতে সরকার সমর্থিত দলের বাধা, হামলা হওয়ায় তারা মাঠে বেশি সময় অবস্থান করতে না পারলেও সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা হতে থাকে। 
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একেএম রেজাউল করিম বলেন, দলের ভেতর এখন উল্লেখ করার মতো কোন কোন্দল নেই। দল অনেক চাঙ্গা, অনেক শক্তিশালী। ঘাটাইল পৌরসভার মেয়র মঞ্জুরুল হক বলেন, সরকারি দলের প্রভাব বিস্তারের পরও দলের শক্ত অবস্থানের কারণেই গত ইউপি নির্বাচনে ১১টি ইউনিয়নের ৯টিতেই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। একমাত্র পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি জয় পেয়েছে। নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন হলে এ আসনটি আমরা উদ্ধারে সক্ষম হব।